চলতি বছর শিশুর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সহিংসতা হয়েছে। যা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। এমন পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার করণীয়ও অস্পষ্ট। লিখেছেন সুমাইয়া জামান
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রতি ছয় শিশুর একজন যুদ্ধ বা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বেড়ে উঠছে। গোলাগুলি, ক্ষুধা ও রোগের মারাত্মক বিপদের মধ্যে রয়েছে তারা। এ সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালে জাতিসংঘ ২৬টি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ২২ হাজার ৫৫৭ শিশুর বিরুদ্ধে রেকর্ড ৩২ হাজার ৯৯০টি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে, যা গোটা সহিংসতার একটি চূড়া মাত্র।
১৯৮৯ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি অনুযায়ী জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি) জাতি, ধর্ম বা ক্ষমতা নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকারের রূপরেখা দিয়ে থাকে। যে কনভেনশনে বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য পরিষেবার অধিকার রয়েছে। সব ধরনের শারীরিক বা মানসিক সহিংসতা, আঘাত বা অপব্যবহার, অবহেলা বা অবহেলামূলক চিকিৎসা, অপব্যবহার বা শোষণ থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ ছাড়া সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতিতে শিশুর সুরক্ষা এবং যতœ নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। ১৯৮৯ সাল থেকে তিনটি অতিরিক্ত প্রোটোকল তৈরি হয়েছে, যার একটি বিশেষভাবে সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের সম্পৃক্ততা নিয়ে। ৩৩ দেশে পরিচালিত জার্মান এনজিও ‘কিন্ডারনোথিল্ফ’ (শিশুদের জরুরি সহায়তা)-এর শিশুদের অধিকার বিশেষজ্ঞ ফ্রাঙ্ক মিশো বলেন, সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী দ্বারা শিশুদের যেকোনো ব্যবহার শিশুশ্রম এবং শিশুদের অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হয়। ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। শিশু অধিকারের কনভেনশনে বেশিরভাগ দেশের স্বাক্ষর রয়েছে। যদিও কিছু রাষ্ট্র চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। যেমন উদাহরণস্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোমালিয়া তা করেনি। এ ছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়া রয়েছে, যা শিশুদের সুরক্ষার জন্য কাজ করে। যেমন ‘নিরাপদ স্কুল ঘোষণা’, যা সশস্ত্র সংঘাতের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব থেকে ছাত্র, শিক্ষক, স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করার জন্য একটি আন্তঃসরকারি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘের শিশু অধিকার বিষয়ক কমিটি কার্যকরভাবে প্রতিনিয়ত বিশ্বের প্রতিটি দেশে পর্যবেক্ষণ করে যে শিশু অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
আইন
জাতিসংঘের মহাসচিবের একজন বিশেষ প্রতিনিধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এ ক্ষেত্রে। তারা যুদ্ধের সময় শিশু অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন নথিভুক্ত করে থাকে। জাতিসংঘ জানিয়েছে যে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শিশুদের হত্যা এবং পঙ্গু করা, সশস্ত্র বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীতে শিশুদের নিয়োগ বা ব্যবহার, স্কুল বা হাসপাতালে আক্রমণ, ধর্ষণ বা অন্যান্য গুরুতর যৌন সহিংসতা, শিশুদের অপহরণ এবং মানবিক অধিকার অস্বীকারের শিকার হচ্ছে শিশুরা। যারা শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন করে তাদের হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সামনেও আনা যেতে পারে। ২০২৩ সালে আইসিসি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের জন্য একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে বলেছিল যে, যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে তিনি যুদ্ধাপরাধের জন্য এবং ইউক্রেনের অধিকৃত এলাকা থেকে জনসংখ্যাকে বেআইনিভাবে স্থানান্তরের জন্য দায়ী ছিলেন।
ইউক্রেনের চিলড্রেন হোম এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার শিশুকে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের রুশ-অধিকৃত অঞ্চলে স্থানান্তর করার অভিযোগ রয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। মিশো বলেন, সশস্ত্র সংঘাত এবং যুদ্ধে নিহত বা আহত হওয়ার ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুদের পর্যাপ্ত খাবার এবং বাসস্থান থেকে বঞ্চিত করা হয। এমন অবস্থায় শিশুরা প্রায়ই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এ অনিরাপদ জীবনযাত্রার কারণে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, যৌন সহিংসতা এবং শিশুশ্রমের বৃদ্ধি ঘটে। শিশুরা এমন পরিস্থিতিতে যে সংকট মোকাবিলা করে তা প্রাপ্তবয়স্করাও খুব কম মোকাবিলা করে থাকে। ইউনিসেফ বলছে, বেশিরভাগ দেশ শিশু অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন অনুমোদন করা সত্ত্বেও যুদ্ধরত পক্ষগুলো প্রায়ই যুদ্ধের সবচেয়ে মৌলিক নিয়মগুলোর মধ্যে একটি ‘শিশুদের সুরক্ষা’ লঙ্ঘন করে।
গাজার শিশু
জাতিসংঘের মতে, ২০২৩ সালে অধিকৃত ফিলিস্তিনের গাজা, ইউক্রেন এবং সুদানের শিশুদের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন ছিল। এ সময় শিশু অধিকার লঙ্ঘনের এক-চতুর্থাংশ গাজায় ঘটেছে। অনেকে বলে যে গাজা বর্তমানে বিশে^র শিশুদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক স্থান। স্কুল ও হাসপাতালের হামলা এতটাই নিয়মতান্ত্রিক যে, সামরিক ভাষায় এগুলোকে আর ব্যাখ্যা করা যায় না।
জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর গাজার প্রতি তিনজনের মধ্যে এক শিশু তীব্রভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে। হামাস পরিচালিত সরকারি মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানান, গাজায় অপুষ্টিতে ২৯ শিশুসহ ৩৩ জন মারা গেছে, তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অবশ্য শুধু গাজা নয়, রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী গত বছর ৫ বছরের কম বয়সী ৩৬ মিলিয়নের বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ মিলিয়ন শিশুর অপুষ্টি মারাত্মক। গাজার অবস্থা এমন ছিল না। কিন্তু ইসরায়েল হামলা শুরুর পর তারাও অপুষ্টির অমানবিক তালিকায় ঢুকে যায়। দক্ষিণ সুদান এবং মালিতে হাজার হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করছে দীর্ঘ বছর ধরে। এ ছাড়া নাইজেরিয়া এবং কঙ্গোতেও নিয়মিত খাদ্যবঞ্চনার শিকার হতে হয় অনেককে। গাজা এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি। যার কারণ ইসরায়েলি হামলা। এ পর্যন্ত যে হামলায় নিহত হয়েছে ৩৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। উদ্বাস্তু হয়েছে কয়েক লাখ। খাদ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করেছে ইসরায়েল। যে কারণে অপুষ্টি চরম আকার ধারণ করে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় গাজার বেশ কিছু কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে ইসরায়েল গাজায় সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে। পরে কিছু মানবিক সরবরাহ প্রবেশের অনুমতি দিলেও পরে আবার বাধা দেয়। যার ফলে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামলা বন্ধ হলেও গাজায় খাদ্যবঞ্চনা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় নিহত হওয়া ৮ হাজার ১১৯ জন মানুষের বিস্তারিত তথ্য তারা যাচাই করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিহত মানুষের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু এবং ২৬ শতাংশ নারী। বেশিরভাগেরই বয়স পাঁচ থেকে নয় বছরের মধ্যে। নভেম্বরে আইসিসি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। বিশেষজ্ঞ মিশো বলেন, যুদ্ধের সময় শিশুদের অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন বন্ধ করতে এ ধরনের আইনি কার্যক্রম সবচেয়ে কার্যকর।
জাতিসংঘ তাদের জুন মাসের এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জন শিশু প্রতি মাসে সহিংস পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। এটা প্রতি মাসে সাড়ে চার কোটি শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিশু সুরক্ষায় অগ্রগতি সত্ত্বেও সহিংসতা, নিপীড়ন ও শোষণ-বঞ্চনার কারণে লাখ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিসেফের নতুন তথ্যে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪০ কোটি শিশু বা এই বয়সীদের মধ্যে প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে ৬টি শিশু নিয়মিত বাসায় শারীরিক আঘাত বা শারীরিক শাস্তি সহ্য করে। তাদের মধ্যে ৩৩ কোটির মতো শিশুকে শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকে। বিস্তারিত দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
জাতিসংঘের কয়েক বছর আগের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শিশুরা শারীরিক, মানসিক এবং যৌনসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার সম্মুখীন হয়। শিশুর সঙ্গে অপব্যবহার যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে। যেমন বাড়িতে, স্কুলে, সম্প্রদায়ে এবং অনলাইনে। এ ধরনের সহিংসতার প্রভাব আঘাতমূলক হতে পারে, যা প্রায়ই আজীবন পরিণতির দিকে পরিচালিত করে। তারা জানায়, বিশ্বব্যাপী ৪৫০ মিলিয়নেরও বেশি শিশু সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাস করত যেখানে তাদের নিরাপত্তা এবং সুস্থতা ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে ছিল। সংঘাত ও সহিংসতায় চার কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী নরহত্যা প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি শিশুকে হত্যা করে। ২৪০ মিলিয়নেরও বেশি শিশু তাদের স্কুলে এবং তার আশপাশে সহিংসতার সম্মুখীন হয়। পাচারের শিকারদের পঁয়ত্রিশ শতাংশই শিশু। প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের সাইবার বুলিংয়ের সম্মুখীন হয়েছে। প্রায় ১৬০ মিলিয়ন শিশু শিশুশ্রমের সংস্পর্শে এসেছে। মেয়েরা বিশেষ করে দুর্বল। বর্তমানে জীবিত আনুমানিক ৬৪০ মিলিয়ন নারী এবং মেয়েশিশু হিসেবে বিবাহিত হয়েছে। তা ছাড়া দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি শিশু চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে, এমনকি বিশ্বের ধনী দেশগুলোতেও। জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য আরেকটি হুমকি। এটি দারিদ্র্য, স্থানচ্যুতি এবং শিক্ষার ক্ষতির মতো বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকে বড় করে, যা সহিংসতাকে বাড়িয়ে তোলে। আনুমানিক ১ বিলিয়ন শিশু এখন জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
চলতি বছর এ ধরনের সহিংসতা আরও বেড়েছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। যাতে জাতিসংঘ বলছে সর্বোচ্চ সহিংসতার বছর। এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার সহজ উপায় নেই। সহসাও নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না। বিশ্বনেতাদের যৌথভাবে উপলব্ধি করতে হবে এ থেকে নিস্তার পাওয়ার বিষয়টি। সে জন্য সহজ ও সরল কর্মপন্থা বের করতে হবে সম্মিলিতভাবে। অন্যথায় আজকের দুর্বল, সহিংস অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশু ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হবে। পৃথিবীকে নির্মল, কোমল ও আদরণীয় করে তুলতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
