জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামান ও প্রকৌশলী শুভাশিষ রায়ের বিরুদ্ধে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও উন্নয়ন তহবিলের কাজে ব্যাপক দুর্নীতি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির যোগসাজশে এসব প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এসব প্রকল্পের মধ্যে কোনোটির অর্ধেক, আবার কোনোটির কাজ না করেই টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। ভুতুড়ে প্রকল্পের নামেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় জানায়, ১১টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে মেলান্দহ উপজেলা গঠিত। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ২৮টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প, তদারকি ও আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ ৯৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের আওতায় ১৫টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এসব প্রকল্পে ৮১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কমিটির মাধ্যমে করা ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে সাতটি ইউনিয়নের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণে সাতটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বাকি পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মাহমুদপুর ইউপির ল্যাট্রিন মেরামত, আদ্রা ইউনিয়নের রাস্তা সংস্কার, ফুলকোচা ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ইটের বেঞ্চ নির্মাণ, ঝাউগড়া ইউপির বাউন্ডারি ওয়ালে গ্রিল নির্মাণ, বিদ্যালয়ের দুস্থ শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুলব্যাগ বিতরণ। এ ছাড়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য ২ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ প্রকল্প থাকলেও ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ করা হয়নি। এ ছাড়া মাহমুদপুর ও আদ্রা ইউনিয়নের ল্যাট্রিন মেরামত এবং রাস্তা সংস্কারের কোনো চিহ্ন নেই। বিভিন্ন স্থানে ইটের বেঞ্চ নির্মাণের কথা থাকলেও সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামানের বাড়ির পাশে একটি মাত্র বেঞ্চ দেখা গেছে। বিভিন্ন জায়গায় আরসিসি পাইপ সরবরাহের কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
উপজেলার এমএ গফুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কয়েক বছরের মধ্যে কোনো ক্রীড়াসামগ্রী পাইনি। আমরা কখনো চাইতেও যাইনি।’ জাহানারা লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘উপজেলা থেকে আমাদের বিদ্যালয় ক্রীড়াসামগ্রী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা স্কুলব্যাগ পায়নি।’
উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের ১৫টি প্রকল্পের খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দরপত্রের মাধ্যমে চারটি ও কোটেশনের মাধ্যমে ১১টি প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে। কোটেশনের মাধ্যমে করা প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। মেলান্দহ বাজার থেকে খাশিমারা বাজার রাস্তায় ইউ-ড্রেন নির্মাণের কথা থাকলেও সরেজমিনে ওই প্রকল্পের নামে কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। উপজেলা অফিসার্স ক্লাব মেরামতের জন্য একটি প্রকল্পে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ক্লাবটির বাইরের অংশে কোনো কাজ দেখা যায়নি। তবে উপজেলার বিভিন্ন রাস্তার পানি নিষ্কাশনের জন্য পাইপ সরবরাহের ১০ লাখ টাকার প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ইউএনওর বাসভবন মেরামত ও রঙকরণে ৬ লাখ টাকার প্রকল্পে নামমাত্র রঙ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় সোলার লাইট স্থাপন প্রকল্পে কিছুসংখ্যক লাইট স্থাপন করা হয়েছে। যার বেশিরভাগ লাইট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে।
মেলান্দহ উপজেলা অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ক্লাবের জন্য কত টাকা বরাদ্দ ছিল তা আমি অবগত না। এটা ইঞ্জিনিয়ার অফিস বলতে পারবে। তবে ক্লাবে মেঝে, বিদ্যুৎ ও রঙের কাজ হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামানের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আত্মগোপনে থাকায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। আর উপজেলা প্রকৌশলী শুভাশিষ রায়ের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করে এবং খুদেবার্তা পাঠিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি প্রফেসর ড. মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধির যোগসাজশে দুর্নীতি হলে তা জনগণের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। এসব প্রকল্পের বিষয়ে আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
