দুর্ঘটনায় আহতকে আন্দোলনে আহত দেখিয়ে মামলা

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:১০ এএম

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে চট্টগ্রামে একাধিক চক্র মামলা বাণিজ্য করছে। মামলার এজাহার বা আদালতে করা ফৌজদারি অভিযোগ থেকে ‘আসামির’ নাম বাদ দেওয়ার নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধান এবং তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে চট্টগ্রামের আদালতে মিথ্যা অভিযোগে হওয়া এমন একটি মামলার খোঁজ মিলেছে। যেখানে সড়ক দুর্ঘনায় আহত ব্যক্তিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় হামলার শিকার দেখিয়ে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মামলার আরজিতে বাদী ও কথিত হামলার শিকার ব্যক্তির নাম-ঠিকানাও দেওয়া হয়েছে ভুয়া। 

জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে নগরের কাপ্তাই রাস্তার মাথায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন ৪৭ বছর বয়সী এক দিনমুজর। অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে সেদিন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তাকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে। প্রায় আড়াই মাস ধরে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ ওই ব্যক্তি চিকিৎসাধীন থাকার পর চমেক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ এই ব্যক্তির প্রকৃত নাম নিজাম উদ্দিন (৪৭)। অথচ তার নাম মিজান (৫০) এবং নিজের ভগ্নিপতি দাবি করে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ৫০ জনকে আসামি করে আদালতে ফৌজদারি অভিযোগ করেন শারমিন নামে এক নারী। যাতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে নগরের চান্দগাঁও বালুরটাল এলাকায় আসামিরা লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মিজানের (প্রকৃত নাম নিজাম উদ্দিন) হাত-পা ভেঙে দেয়। কাল্পনিক হামলার ওই ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে ৯ অক্টোবর ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেন শারমিন আক্তার। আদালতের নির্দেশে ওই অভিযোগ তদন্ত করছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি-উত্তর) উপপরিদর্শক ফজলে রাব্বি কায়সার। দুই মাস তদন্ত শেষে বাদী শারমিনের অভিযোগ ভুয়া এবং দুর্ঘটনায় আহতের নাম মিজান নয় নাজিম উদ্দিন (৪৭) বলে জানান ডিবির এই কর্মকর্তা।    

ফৌজদারি অভিযোগে বাদীর ঠিকানা লেখা হয়েছে- ডিসি রোড, জামাল সাহেবের বাড়ি, থানা-চকবাজার, জেলা-চট্টগ্রাম। এতে আসামি করা হয়েছে ৫০ জনকে। এক নম্বর আসামি আবদুল মান্নান ওরফে হাতি মান্নান (৫৫)। তিনি চট্টগ্রামের চাক্তাই নয়া মসজিদ এলাকার আবদুল হামিদের ছেলে। বাদী পেশায় একজন গৃহিণী। আহত মো. মিজান (৫০) তার মেজ বোনের স্বামী। কিন্তু আদালতে করা ফৌজদারি অভিযোগের কোথাও আহত মিজানের বাবা-মার নাম ও তার বাড়িঘরের ঠিকানা উল্লেখ করেননি বাদী।

বাদী শারমিনের দাবি, ২৬ জুলাই বিকাল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানাধীন বাকলিয়া স্কুলের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন আহত মিজান। এর জেরে দুই মাস পর ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে চান্দগাঁও থানার বালুরটাল ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় মিজানকে মারধর করে গুরুতর জখম করা হয়। আহত অবস্থায় পথচারীরা ‘অ্যাক্সিডেন্ট রোগী’ হিসেবে মিজানকে চমেক হাসপাতালের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করায়।

এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গত ২৪ নভেম্বর চমেক হাসপাতালে গেলে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের নিবন্ধন খাতা দেখে সিনিয়র নার্স শামসুন নাহার জানান, ২৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ‘অজ্ঞাত’ ওই রোগীকে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তার নিবন্ধন নম্বর ১১৫৩০৯। কিন্তু সেদিন ওই রোগীকে (নিজাম) পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সিনিয়র নার্স শামসুন নাহার বলেন, ‘১২/১৩ দিন আগে ওই রোগী হাসপাতাল থেকে পালিয়েছেন। এজন্য তার চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো ফাইলপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। বেশ কিছু দিন ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন ওই ব্যক্তি। এই রোগীর ভর্তির রেজিস্টারে রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্সিডেন্ট (আরটিএ) লেখা আছে।’

আরজিতে বাদীর দেওয়া ঠিকানা ধরে গত ২৪ নভেম্বর চকবাজার ডিসি রোডের সেই জামাল সাহেবের বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। জামাল সাহেবের বাড়ির বাসিন্দা এবং স্থানীয়রা জানান, শারমিন আক্তার নামে কোনো নারীকে তারা চেনেন না। জানা গেছে, বাদীর অভিযোগে আহতের নাম মিজান (৫০) উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তার নাম নিজাম উদ্দিন। বয়স ৪৭। গ্রামের বাড়ি রাঙ্গামাটির লংগদু এলাকায়। থাকতেন হাটহাজারী উপজেলার কুয়াইশ গ্রামে। বর্তমানে নিজাম উদ্দিন রাঙ্গামাটির মারিশ্যা এলাকায় ছোট ভাইয়ের জিম্মায় আছেন বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

ফৌজদারি অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর ডিবির (উত্তর) এসআই ফজলে রাব্বি কায়সার বলেন, ‘আরজিতে বাদী যে ঠিকানা দিয়েছেন সেটির অস্তিত্ব পাইনি। তদন্তে জানা গেছে, এই নারী থাকেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণ কুয়াইশ গ্রামের গোলাম গাছতল এলাকায় কাশেম কলোনিতে।’ সম্প্রতি তাকে (বাদী) ডিবি কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয় জানিয়ে ফজলে রাব্বি বলেন, ‘বাদীকে আহতের মেডিকেল কাগজপত্র দিতে বলেছি। কিন্তু তিনি তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অভিযোগ তদন্তের স্বার্থে কয়েকদিন আগে দক্ষিণ কুয়াইশ এলাকায় গেলে পালিয়ে যান বাদী শারমিন আক্তার।’

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার সাংবাদিক পরিচয়ধারী জোবায়ের, ফিরোজসহ কিছু দুর্বৃত্ত চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে কথিত বাদী শারমিনকে দিয়ে আদালতে ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। সাংবাদিক পরিচয়ধারী জোবায়ের একসময় অটোরিকশা চালাতেন। এখন বনে গেছেন সাংবাদিক। আদালতে এফিডেভিট দিয়ে নাম প্রত্যাহারের বিনিময়ে বিভিন্ন আসামির কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে ওই চক্র।’

শারমিনের করা অভিযোগের ১ নম্বর আসামি আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভুয়া এবং সাজানো। কিছু দুর্বৃত্ত মামলা বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে ওই নারীকে দিয়ে আমিসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দিয়েছে। আমার কাছে নাম কাটানোর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে চক্রটি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত