নির্বাচনে ‘আওয়ামী জুজু’

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:৩৮ এএম

প্রতি বছর ডিসেম্বরের শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। করোনা মহামারীর সময়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এবার ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্বাচনের ডামাডোল নেই। নির্বাচন আয়োজনে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বর্তমান কমিটি। শিক্ষকরা বলছেন, ডিসেম্বরে তো নয়ই, নির্বাচন হবে কি না নিশ্চিত বলা সম্ভব হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১৫ বছরে সমিতিতে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরাই আধিপত্য বিস্তার করেছেন। এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ভোট হলে আওয়ামীপন্থি নীল দলের শিক্ষকদের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। এ কারণে বিএনপিপন্থি সাদা দলের শিক্ষকরা এখন নির্বাচন চায় না।

গত বছর ১২ ডিসেম্বর ঢাবি শিক্ষক সমিতির ২০২৪ সালের কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন বিএনপিপন্থি সাদা দল বর্জন করায় বিনা ভোটে সব পদে জিতেছিল আওয়ামী লীগপন্থি নীল দলের সদস্যরা। নীল দলের বাইরে অন্য কোনো প্যানেল বা প্রার্থী ছিল না সে নির্বাচনে। সেবার শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছিলেন অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া ও অধ্যাপক জিনাত হুদা। গত ১৫ বছরে ঢাবি শিক্ষক সমিতির যত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সবকটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আওয়ামীপন্থিরা।

নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষক সমিতির বর্তমান কমিটিই পরবর্তী নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষককে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয় তারা। তিনিই নির্বাচনের সব আয়োজন করেন। এবার ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বয়কট করেছে বর্তমান শিক্ষক সমিতির কমিটিকে। নেতৃত্বে থাকা প্রায় সব শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের বয়কটের শিকার হন। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। বিএনপিপন্থি শিক্ষকরাও বলছেন, বর্তমান কমিটির কোনো এখতিয়ার নেই নির্বাচন আয়োজনের। এ কমিটি অবৈধ।

শিক্ষক সমিতির নির্বাচন ইস্যুতে সম্প্রতি সমিতির বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সভা হয়েছে। সভায় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্তে হয়নি। নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা যাবে কি না, সে বিষয়ে সভায় সংশয় প্রকাশ করা হয়। সভায় উপস্থিত সমিতির একজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সভায় নির্বাচন ইস্যুতে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের তারিখ, নির্বাচন কমিশন গঠন প্রভৃতি ইস্যু উঠেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন কঠিন বলে মত দিয়েছেন সবাই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

একই ইস্যুতে বৈঠক করেছে সাদা দল। সভায় নির্বাচনের পক্ষে মত দেননি কোনো শিক্ষক। বলা হয়েছে, বর্তমান কমিটির নির্বাচন আয়োজনের এখতিয়ার নেই। তারা অনির্বাচিত। এখন দেশের শিক্ষাসহ নানা সংকটে ভূমিকা রাখাই মুখ্য। জাতীয় নির্বাচনের আগে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন চান না তারা।

ভোট হলে জেতার সম্ভাবনা আওয়ামীপন্থিদেরই : বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ২২৯৯। অধ্যাপক ১ হাজার ১৩২, সহযোগী অধ্যাপক ৩৬৩, সহকারী অধ্যাপক ৫৪০ ও প্রভাষক ২৩৫ জন। আগের নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা। শুধু শিক্ষক সমিতিই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নির্বাচনেরই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্বাচনে ১ হাজার ৮০০ ভোটার-শিক্ষকের ১০০০-১২০০ জনেরই ভোট পেতেন আওয়ামীপন্থিরা, ৩০০-৪০০ জনের ভোট পেতেন বিএনপিপন্থিরা।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও ভোটচিত্র এখনো একই রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষকরা। সাদা দলের শিক্ষকরা মনে করেন, গত ১৫ বছরে বেশিরভাগ আওয়ামী সমর্থকই শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতেন। ২০২২ সালে সিন্ডিকেট নির্বাচনে প্রভাষক পদে নির্বাচন করার জন্য একজনকেও পায়নি সাদা দল। ৫ আগস্ট সরকার পতন হলেও এখনো আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদেরই আধিপত্য রয়ে গেছে। তাই এ সময় শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হলে তাদের সমর্থিতদেরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে।

সাদা দলের একজন সিনিয়র শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৫ আগস্টের আগপর্যন্ত শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সাদা দলের পক্ষে ৩০০-৪০০ ভোট পড়ত। এখনই এ চিত্রের পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত হবে না। তাছাড়া এ কমিটি নির্বাচন আয়োজনের নৈতিক সামর্থ্য হারিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত নির্বাচনে আমরা অংশ নিইনি ফলে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা নিজেরা নিজেদের নির্বাচিত করেছেন। এ ধরনের অনির্বাচিত কমিটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী শিক্ষক সমিতির নির্বাচন আয়োজনের নৈতিক অধিকার থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনসহ কোনো নির্বাচনের উপযুক্ততা আছে বলে মনে হয় না। এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচনের সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।’

সাদা দলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করায় বর্তমান শিক্ষক সমিতির কমিটিকে আমরা বয়কট করেছি। তারা গত নির্বাচনে ভোট ছাড়া জয়লাভ করছিল এবং সরাসরি শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের কোনো কর্মকা- করার অধিকার নেই, তারা করছেও না। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও তারা এক ধরনের বয়কটের মুখে আছে। এই মুহূর্তে নির্বাচন আয়োজনে তাদের এখতিয়ার নেই। দেশের বর্তমান সংকট মুহূর্তে নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি বা সুযোগ কোনোটাই নেই বলে আমরা মনে করি। আমরা নির্বাচন করব না এবং শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হবেও না। শিক্ষাসহ নানা সংকটে আমরা সরকারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে চাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনো নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়নি। আমরা দু-এক দিনের মধ্যে সবার সঙ্গে বসব। আলোচনা করে নির্বাচন দিয়ে দেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত