সিরিয়া নিয়ে রাশিয়ার কপালে ভাঁজ

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:৫৪ এএম

সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল রাশিয়া। বিদ্রোহীদের অভিযানের মুখে পদত্যাগ করে পালিয়ে মস্কোয় রাজনৈতিক আশ্রয় নেন বাশার আল আসাদ। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছে। তবে আসাদ সরকারের পতনের ফলে সিরিয়ায় স্থাপিত রুশ সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট সমাধানে বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শামের রাজনৈতিক পরিষদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবার রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল বোগডানোভের বরাতে এই তথ্য জানায় রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স।

ইন্টারফ্যাক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরিয়ায় স্থাপিত রুশ সামরিক ঘাঁটিগুলো সরাতে চায় না মস্কো। সে লক্ষ্যে দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে সাংবাদিকদের জানান বোগডানোভ। তিনি বলেছেন, এইচটিএসের সঙ্গে যোগাযোগের গঠনমূলক অগ্রগতি হচ্ছে। অতিরিক্ত সহিংসতা প্রতিরোধ, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কূটনীতিবিদ ও বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারগুলো তারা রক্ষা করবে বলে ক্রেমলিন প্রত্যাশা করছে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়া তাদের দুটি সামরিক ঘাঁটি ধরে রাখতে চায়। এগুলো হলো তারতুসের নৌঘাঁটি ও লাটাকিয়া শহরের নিকটবর্তী হোমেইমিমের বিমানঘাঁটি। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই ঘাঁটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোগডানোভ বলেন, এখনো সিরিয়ার ভূখণ্ডে এই ঘাঁটিগুলো বিদ্যমান। অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে এগুলো সিরীয় সরকারের অনুরোধে স্থাপন করা হয়েছিল। রাশিয়া মনে করে যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ও আইএসের অবশিষ্টাংশের মোকাবিলা এখনো শেষ হয়নি। এই লড়াই চালিয়ে যেতে সমষ্টিগত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। খেমেইমিম ঘাঁটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিরিয়া ও এর আশপাশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির আরেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ভার্শিনিন ও জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জেইর পেডারসেন। সিরিয়ার জনগণের চাওয়া অনুযায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিতের বিষয়ে দুই কূটনীতিবিদের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এদিকে, সিরিয়া প্রসঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, সিরিয়ার পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যাতে একযোগে কাজ করে সে বিষয়ে জোর দিয়েছেন দুই নেতা। পৃথক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক যাতে সিরিয়ার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করে তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দুই নেতার বৈঠকে। দেশটিতে গৃহযুদ্ধ থামলেও, উত্তর সিরিয়ার কুর্দি-শাসিত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। যুক্ত রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট কুর্দিদের নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের সঙ্গে তুরস্কের সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন ব্লিঙ্কেন। সেখানে তারা সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন। দুজনেই সিরিয়াকে সুরক্ষিত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। এ ছাড়া এই সপ্তাহান্তে আরব ও বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জর্ডানে এসে সিরিয়া নিয়ে আলোচনা করবেন। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা অর্জনে চীন ও মিসরের শান্তিও আলোচনার প্রচার করা উচিত বলে মনে করেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। এ বিষয়ে চীন মিসরের সঙ্গে একমত বলেও জানান তিনি। শুক্রবার বেইজিংয়ে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির সঙ্গে বৈঠকে এই মন্তব্য করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, উভয় দেশ সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশটির সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বানও জানিয়েছে তারা। এ সময় উভয় দেশই ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকেও স্বাগত জানিয়েছে বলে জানান চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সিরিয়া ইসরায়েলের আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। সিরিয়ায় তেল আবিবের টানা হামলা অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে গোলান মালভূমির সিরীয় অংশের হারমোন পর্বতও দখল করেছে ইসরায়েল। আসাদ সরকারের পতনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ইসরায়েলি সৈন্যরা ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যকার বাফার জোন দখল করে নিয়েছে। এ নিয়ে বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে পড়েছে ইহুদিবাদী এই দেশটি। তবে সমালোচনা সত্ত্বেও সিরিয়ার সীমান্ত অঞ্চল থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তারা সিরিয়া সীমান্ত থেকে থেকে সরবেন না। শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকা। জেরুজালেমে ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন বাইডেন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সালিভান। বৈঠকের পর নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, যতদিন সিরিয়ার পক্ষ থেকে ইসরায়েলিদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত না করা হচ্ছে তত দিন বাফার জোন ছাড়বে না ইসরায়েলি সেনারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত