মারপ্যাঁচের ঐক্য ও বিভাজন

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৫৬ এএম

গণ-অভ্যুত্থান গণ-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। তাই গণ-অভ্যুত্থান নৈরাজ্য তো নয়ই, এমনকি বিশৃঙ্খলও না। তবে গণ-অভ্যুত্থানের সব কিছু নিয়মের মধ্যে না পড়লেও এর ফলাফলকে নিয়মের মধ্যে আনতে পারলেই গণ-অভ্যুত্থানের কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব। সেটাই হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থান ও নৈরাজ্যের মধ্যে পার্থক্য। নিঃসন্দেহে এবারের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ করে দিয়েছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভাজন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার।

আমাদের জাতীয় জীবনের অগ্রগতি নির্ভর করছে, অনেকগুলো সূচকের ওপর, এ সময়ের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়া মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। তবে এই দুটোর জন্যই দরকার ঐক্যবদ্ধ জাতীয় শক্তি। সেই ঐক্যবদ্ধ জাতীয় শক্তিই আমাদের জাতীয় জীবনে দীর্ঘমেয়াদে অধরাই হয়ে থাকছে। খণ্ডিত জাতি শুধু খণ্ডিত শক্তিরই প্রকাশ করে না, বরং একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে, নিজেদের শক্তির ক্ষয় করে। মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির ক্ষয় করে। একই ঘটনা ঘটে আসছে দশকের পর দশক ধরে। সর্বনাশা এই জাতীয় চর্চা থেকে বের হয়ে আসা দরকার, সেক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে সব পক্ষকেই। ইতিহাস বলে এ দেশে জোর করে কোনো কিছুই সম্ভব না, আবার কাউকে ধ্বংস করাও সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যই সবচেয়ে কাক্সিক্ষত এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে শাসক গোষ্ঠীকে।

তবে এই যুগে এখন আর সবকিছু সরকার ও সরকারবিরোধীদের ওপর নির্ভর করেন না। এখন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অনেকগুলো পক্ষ নিয়োজিত থাকে। এদের মধ্যে অনেকেই থাকে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। যারা সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। হিংসা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে, নিজেরা ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। সময়টা এখন তথ্য প্রবাহের। তথ্য প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে। আর এ সময়ের তথ্য হয়ে উঠছে ন্যারেটিভ বা বয়ান। এতে থাকে তথ্য, অপতথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য, আবেগ, রোমাঞ্চের এক  মিশেল। এ এমন এক বটিকা, যা সত্য না হলেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে যা যা করতে হয় তার ক্ষমতা এই বয়ানের আছে।

এমনভাবে এসব বয়ান তৈরি করা হয়, যা মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়, অন্যের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেয়। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বিপরীতে বিভক্তি তৈরি করে। বয়ান তৈরিতে এ সময় বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার বেশ জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। বলা বাহুল্য, এসব বয়ান তৈরির মাধ্যমে তারা সমাজে যেমন নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন এবং একই সঙ্গে তথা কথিত বৈধ উপায়ে নিজেদের পকেটটাও ভারী করতে পারতে পারেন। ইনফ্লুয়েন্সারদের অনেক সময় হিংসা, বিদ্বেষ ও সংঘাত সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে জনমত সৃষ্টি করতে দেখা যায়। কদাচিৎ এরা সামাজিক বিভিন্ন  সমস্যা, অসংগতি নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিশেষ করে অজনপ্রিয় সামাজিক অসংগতি নিয়ে কথা বলতে এরা অস্বস্তিতেই থাকেন। এদের অনেকের কাছেই সামাজিক ইস্যু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়। কারও কাছে তো রাজনীতি মানে হচ্ছে অমুককে দেখে নেব, তমুককে বুঝে নেব, প্রতিপক্ষ এটা করলে আমরা অন্যটা করব, কীভাবে প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করা যাবে, হুমকি-ধমকি ইত্যাদি।

অনেকেই বলে থাকেন রাজনীতি একটি বিজ্ঞান। তবে তা সামাজিক বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের যেমন সূত্র আছে, তেমনি সামাজিক বিজ্ঞানের সূত্র আছে। এই সূত্রটাই হচ্ছে প্রতিনিয়ত বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের সমন্বয়। তাই ধ্রুপদি রাজনীতি হচ্ছে জনগণের সামনে উদ্ভাবনী রাজনৈতিক এজেন্ডা উপস্থাপন করা ও জাতীয় সমস্যার সমাধান করা। তবে গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শটকার্ট বা সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির চর্চা শুরু হয়েছে। আর তা হচ্ছে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া, বিভক্তি উসকে দেওয়া এবং এ জন্য মানুষের সংবেদনশীল আবেগকে কাজে লাগানো। আমাদের মতো দেশগুলোতে যেখানে মানুষ সাধারণভাবে আবেগপ্রবণ তাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিভক্তি তৈরি করা একটি কার্যকরী রাজনৈতিক হাতিয়ার। এভাবে একের পর আরেক বিভাজন প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।

উগ্র কোনো মতাদর্শই স্থায়ী না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উগ্র মতাদর্শের পতন হয় একটি বিপর্যয় করার মধ্য দিয়ে। নাৎসি ফ্যাসিবাদেরও পতন হয়েছে বিপর্যয়ের মাধ্যমে। তবে তার  পেছনের ইতিহাসও জানা দরকার, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরাজিত জার্মানিকে জোরপূর্বক ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে সাধারণ জার্মানরা অপমানিত বোধ করেছিল যা তাদের অতি জাতীয়তাবাদী হিসেবে রূপান্তর করেছিল। মূল বিষয়টা হলো, কাউকে অপমান করে বা জোর করে দমিয়ে রাখা যায় না, পাশাপাশি তার সংবেদনশীলতাও আশা করা যায় না, আস্থায় নিতে পারাটাই মূল বিষয়, সেটাই সংস্কারের প্রথম ধাপ। নাৎসি জার্মান ছিল কট্টর জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত প্রকাশ।

ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে আবার উগ্র ডানপন্থিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, যেমনটা হচ্ছে র্জামানি, ইতালি, ফ্রান্সে। সব ঘটনাকেই বিভাজনের রাজনীতির চরম পরিণতি হিসেবে দেখা যায়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে, সেটাই রাজনৈতিক সূত্র। যখনই আমাদের জাতীয় ঐক্য বিভক্তি ও বিভাজনের শিকার হয়েছে তখনই জাতীয় জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। একইভাবে জাতি যখনই ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে তখনই জাতীয় জীবনে বিশাল পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পেরেছে। তবে এই ঐক্যটা ধরে রাখা যায় না স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর কারণে, যারা সাধারণ জনগণের আবেগ ও অনুভূতিকে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করে এবং আপাত প্রভাব বিস্তার করতে অনেকটাই সক্ষম হয়।

এই অবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে আমাদের জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া ঐক্য কতটুকু বজায় রাখা গেছে? জাতি কী আগের থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, নাকি তাদের ঐক্যে ফাটল ধরছে? সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও ঐক্যের প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নিজেদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রকাশের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্তাব্যক্তিদের একত্রে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি প্রকাশ পেয়েছে। এই ছবিই কি ঐক্যের প্রতীক, নাকি এখানে কোনো মারপ্যাঁচ আছে?

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত