উন্নয়নের হরিলুট

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:০৫ এএম

বাংলাদেশের মানুষের প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে টানা ১৫ বছরের বেশি দেশ শাসন করা শেখ হাসিনা আগস্ট মাসে দেশ ছেড়েছেন। এর সঙ্গে সঙ্গে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। নির্বাচন নিয়ে কারসাজি, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করে ক্ষমতা নিশ্চিত করা সেই সরকারের অন্যতম বয়ান ছিল উন্নয়ন। কিন্তু এই উন্নয়নের বয়ান ছিল মূলত লুটপাটের একটা উপলক্ষ মাত্র। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করাই ছিল ক্ষমতাশালীদের মূল লক্ষ্য। দেশ রূপান্তরে সেই আমলেই ফাঁস হয়েছিল কীভাবে বালিশের দাম লাখ টাকা, সুইয়ের দাম হাজার হাজার টাকা দেখিয়ে এসব প্রকল্পে লুটপাট চলত। স্বৈরাচারী সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অনেকেই এসব দুর্নীতির আলাপ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার সেসব দুর্নীতির তদন্ত করে একটি শ্বেতপত্রও প্রণয়ন করেছে। সেখানে দেখানো হয়েছে, কী বিপুল পরিমাণ অর্থ এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে লুট করা হয়েছে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে যে, বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক টাকাই লুটপাট হয়েছে। এবার প্রধান উপদেষ্টা প্রকাশ্যেই সেই লুটপাটের কথা তুলে ধরেছেন।

সোমবার বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বিশাল বিশাল প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ঋণের টাকায়। এসব প্রকল্পের মোড়কে বিপুল অর্থ লুটপাট করেছে। প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কত বেশি ব্যয় ধরে কাদের হাতে টাকাটা পাচার করে দেওয়া হয়েছে শে^তপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদনে তা তুলে ধরেছে।’ লুটপাটের টাকায় স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করা সম্ভব ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে এমন ধরনের পোষ্যতোষী পুঁজিবাদ তৈরি করা হয়েছিল, যার সুবিধাভোগী ছিল স্বৈরাচার ও তার সহযোগীরা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে যে পরিমাণ কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেটা অর্ধেকে নামিয়ে আনা গেলে দেশের শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ, স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করা সম্ভব ছিল।

আওয়ামী সরকারের আমলে কেবল যে লুটপাটই হয়েছে তা নয়, সে সময় দেশের অবস্থা বোঝাতে মনগড়া উপাত্ত ও পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেশ-বিদেশে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি হয়েছে। যারা সত্যিকারের চিত্র তুলে ধরত তাদের দমন করা হতো। সেসব অপরাধের চিত্রও আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসছে। লুটপাটের মাধ্যমে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরত আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় কাজ হলো পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা। কাজটা কঠিন, কারণ এ বিষয়ক আইন কঠিন। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে সাহস ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি।... অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আংশিক টাকা হলেও যেন ফেরত আনা যায়।’

প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস বিশ্বব্যাপী একজন সম্মানিত ও সমাদৃত ব্যক্তি। তিনি যদি তার সেই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে পাচার হওয়া অর্থ কিছুটা হলেও দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেন তবে তা হবে দেশের মানুষের প্রতি তার দারুণ ভালোবাসার প্রকাশ। তার কথাতেও সেই আশাবাদ ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংকসহ অন্য সব দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার সক্ষম হয়েছে। তারা নতুন উদ্যোগে এবং নতুন উৎসাহে আমাদের সঙ্গে নতুন আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এগিয়ে এসেছে। অর্থনীতির সাফল্যের ব্যাপারে দেশে এবং বিদেশে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে।’ আওয়ামী আমলে উন্নয়নের নামে বিপুল লুটপাট দেশের অর্থনীতির কোমর ভেঙে দিয়েছে। সেই ক্ষতি পুরোপুরি সারানো অসম্ভব। তবে বর্তমান সরকার যদি যথাযথ উদ্যোগ নেয় ও বাস্তবায়ন করে তবে সেই ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে আনা যেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত