প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে সম্ভাব্য সময়সীমার কথা বলেছেন, সে অনুযায়ী নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসব কথা বলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের জন্য আমরা প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু করেছি। তার জন্য যেসব প্রস্তুতির দরকার, তার সবই আমাদের রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় নির্বাচনের যে সময় ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে অনুযায়ী নির্বাচন করতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’
নির্বাচনী রোডম্যাপ সম্পর্কে জানতে চাইলে এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা একটা সময়সীমা তো ঘোষণা করেছেন। সেই অনুযায়ী আমরা এগোব। আমরা পাবলিকলি কোনো রোডম্যাপ ঘোষণার চিন্তা করছি না। তবে কাজ করার জন্য আমাদের নিজস্ব একটি কর্মপরিকল্পনা তো থাকবেই।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে সিইসি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেটা জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে কিছু বলেননি। আমাদের যারা স্টেকহোল্ডার, রাজনৈতিক দল তারাও সংসদ নির্বাচনের কথা বলেছেন। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের থেকে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলেছেন। কাজেই আমরা সংসদ নির্বাচনের কথা ভাবছি।’
বিদ্যমান ভোটার তালিকায় নির্বাচন হবে, নাকি নতুন ভোটার তালিকা করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘দুই মাস পর আমাদের হাতে একটি নতুন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা আসবে। এরপর আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়েও তথ্য সংগ্রহ করব। অনেকে মারা গেছেন, অনেকে বাদ পড়েছেন। অনেক বিদেশি ভোটার হয়েছেন। ভোটারে ডুপ্লিকেশন হয়েছে। এমন তথ্য আমরা পাচ্ছি। এগুলো যাচাই- বাছাই করে আমরা ওই তালিকা সংশোধন করব। ওই সংশোধিত তালিকার আলোকেই ভোট হবে।’
সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণ হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। অতীতে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে অথবা কোনো প্রার্থীকে জেতানোর জন্য বা কাউকে হারানোর জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো সীমানা পুনর্নির্ধারণ হয়ে থাকে, আমরা সেটা অবশ্যই দেখব। ২০০১ সালের সীমানায় হবে না, বর্তমানেরটার ভিত্তিতে হবে। বিষয়টি তা নয়। আমরা ন্যায্যতার ভিত্তিতে এটা করব।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না বলেও জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমের বিষয়ে আমরা চিন্তা করছি না। আমাদের চিন্তা ব্যালটেই ভোট করব। ইভিএম নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়েছে, চলে না, ইভিএম রাখার মতো স্টোরেজ নেই। তাই ইভিএম নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই।’
কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনায় রয়েছে ইভিএম। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে দেশে ইভিএমের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয় (বুয়েট) এবং গাজীপুরের রাষ্ট্রায়ত্ত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সহায়তায় এই প্রযুক্তি চালু হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এবং নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচনের পুরো ভোটগ্রহণ হয় ইভিএমে।
পরে কেএম নুরুল হুদা কমিশন ফের ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস করেছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ওই সময় প্রতি ইভিএমের পেছনে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ খরচ হয়েছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
এরই ধারাবাহিকতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশন প্রথমে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করার জন্য দুই লাখ ইভিএম মেশিন কিনতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল। কিন্তু একনেকে সেই প্রকল্প অনুমোদন পায়নি। পরে নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকা দেড় লাখ পুরনো ইভিএম মেরামতের জন্য সরকারের কাছে ১ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। সরকার সে প্রস্তাবও নাকচ করে দেয়। তাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যালটের মাধ্যমেই করেছে কমিশন। পরে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ইভিএমের প্রকল্প মেয়াদ থাকলেও অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ আর এগোয়নি।
