রহস্যময় স্টোনহেঞ্জ নিয়ে নতুন গবেষণা তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, এ বিরল স্থাপত্যের কার্যকারিতা নিয়েও। লিখেছেন আইয়ুব হোসেন
ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারের অ্যামাসবারির কাছে অবস্থিত স্টোনহেঞ্জ পৃথিবীর এক রহস্যের নাম। যা নিওলিথিক এবং ব্রোঞ্জ যুগের একটি স্তম্ভ। যেটি মানমন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা ছিল। তবে সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের কৃষকদের সংঘবদ্ধ করতে গড়ে তোলা হতে পারে বহু প্রাচীন এ নিদর্শন। গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে প্রাক-ইতিহাস বিষয়ে অধ্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক মাইক পার্কার পিয়ারসন। গবেষকদের একটি দল আগস্টে প্রমাণ দেয় যে, স্টোনহেঞ্জের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আইকনিক মনোলিথ আলটার স্টোন প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ওই স্থানটিতে নিয়ে আসা হয় উত্তর-পূর্ব স্কটল্যান্ড। যদিও পরে আরেকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, পাথরটি স্কটল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলের দ্বীপপুঞ্জ অর্কনি থেকে এসেছে। অর্কনি সেই সময়ে নিওলিথিক সাইটগুলোর আবাসস্থল ছিল। গবেষকরা একে মনোলিথের উৎপত্তিস্থল হিসেবে অনুমান করছেন। তবে দুই গবেষণাতেই বলা হচ্ছে, স্টোনহেঞ্জ সম্ভবত ২৬২০ থেকে ২৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে নির্মিত হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ থেকে নতুনদের আগমনের পর প্রাচীন ব্রিটিশদের একত্রিত করা। আর্কিওলজি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নতুন গবেষণায়ও জানা যায় যে, কীভাবে নিওলিথিক মানুষ ১৩ হাজার ২২৭ পাউন্ড ৬ মেট্রিক টনের ব্লকটি ৪৩৫ মাইল দূরে নেওয়া হয়েছিল।
সংযোগস্থল
ইংল্যান্ডের স্যালিসবারি সমভূমির দক্ষিণ প্রান্ত উইল্টশায়ারে এবং স্কটল্যান্ডে অবস্থিত স্টোনহেঞ্জের পাথরের বৃত্তের মধ্যে মিল দেখে গবেষকরা অনুমান করছেন, প্রাচীন সমাজের মধ্যে সংযোগ তৈরির কাজ করত এ স্থাপনা। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজির ব্রিটিশ পরবর্তী প্রাগৈতিহাসের অধ্যাপক মাইক পার্কার পিয়ারসন বলেন, স্টোনহেঞ্জের মূল উদ্দেশ্য কী হতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের বোঝাবুঝি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে। সেলসবারি প্লেইনের এই সাইটটি ব্রিটেন জুড়ে বসবাসকারী লোকদের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তারা এই একটি স্থানে কখনো কখনো কয়েকশ মাইল দূর থেকে বিশাল মনোলিথ নিয়ে আসে। গবেষকদের মতে, স্টোনহেঞ্জের নির্মাণকাজ খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার সালের প্রথম দিকে শুরু হয়েছিল এবং পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার বছর আগে বেশ কয়েকটি ধাপে এটি ঘটে। পূর্ববর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্লুস্টোন এক ধরনের সূক্ষ্ম-দানাযুক্ত এবং সারসেন নামক বৃহত্তর সিলিসিফাইড বেলেপাথর ব্লকগুলো স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৪০ মাইল দূরের নীল পাথরগুলো পশ্চিম ওয়েলসের প্রেসেলি হিলস এলাকা থেকে আনা হয়েছিল। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, আলটার পাথরটি ২৫০০ এবং ২০২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে স্থাপন করা হয়। স্টোনহেঞ্জ নির্মাণে ব্যবহৃত ব্লুস্টোনগুলোর মধ্যে আলটার স্টোনটি সবচেয়ে বড়। এখন আলটার স্টোনটি বৃহত্তম ট্রিলিথনের পাদদেশে পড়ে আছে এবং ঘাসের মধ্য দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। স্টোনহেঞ্জ এবং বেদি পাথরের সঠিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, গবেষকরা বলেছেন, আলটার স্টোনকে পুনর্নির্মাণের সময় স্টোনহেঞ্জের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছিল। এটি এমনভাবে স্থাপন করা হয়, যাতে শীত ও গ্রীষ্মকালীন সোলসটিসে সূর্যের আলো এর ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রবেশ করে। প্রাচীন ব্রিটেনের মানুষ সূর্য, পূর্বপুরুষ এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের সংযোগ স্থাপন করার জন্য স্টোনহেঞ্জকে একটি বিশেষ স্থানে পরিণত করে। গবেষকরা মনে করেন, এই পাথরগুলো স্থানান্তরের সময় বিভিন্ন সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে কাজ করেছিল। যাত্রাপথে বিভিন্ন উৎসব এবং সমবেত কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে একত্রিত করা হতো। স্টোনহেঞ্জ শুধু ধর্মীয় বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহৃত হতো না। এটি ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষদের জন্য একটি ঐক্যের প্রতীক ছিল। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী পাথরগুলো এখানে স্থাপন করে ব্রিটেনের মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। গবেষকদের ধারণা, স্টোনহেঞ্জ পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে প্রাচীন ব্রিটেনের জনগণ নিজেদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যয়, গবেষক পিয়ারসন বলেন, স্টোনহেঞ্জ নির্মাণে ব্যবহার করা পাথরগুলোর উৎপত্তিস্থল ভিন্ন। হতে পারে ব্রিটেনের বিভিন্ন দ্বীপের কৃষক সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ করতে এ কাঠামো গড়ে তোলা হয়। স্টোনহেঞ্জে বেদির আকৃতির যে পাথর রয়েছে, সেটিও স্কটল্যান্ড থেকে আনা। পাথরটি হয়তো উপহার হিসেবে এত দূর পাঠানো হয়।
পাথর টানা
বিশালাকার পাথরগুলো দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহন করা নিওলিথিক লোকেদের জন্য সহজ ছিল না। অধ্যয়নের লেখকরা মনে করেন না যে, সেই সময়ের নৌকাগুলো আলটার স্টোনের মতো কিছু বহন করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। পার্কার পিয়ারসন বলেছেন, বিশাল পাথরের খণ্ডগুলো সম্ভবত কাঠের রেলের ওপরে স্ল্যাইডিং কাঠের স্লেজে দ্বারা টেনে নিয়ে যেতে হয়েছে। কাঠের স্লেজে গাছপালা থেকে তৈরি শক অ্যাবজরবার থাকতে পারে, যা দীর্ঘযাত্রায় ফাটল প্রতিরোধ করত। শত শত এবং সম্ভবত হাজার হাজার লোকের প্রয়োজন হতো পাথরকে জমির ওপর দিয়ে সরাতে সাহায্য করার জন্য এবং এ জন্য প্রায় আট মাস সময় লাগতে পারে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, স্থলপথে ভ্রমণ, আড্ডা, ভোজ এবং উদযাপনের আনন্দ নিতে হাজার হাজার লোক এ অসাধারণ উদ্যোগের সাক্ষী হতো এবং অংশ নিত। বিশাল পাথরটিকে স্কটল্যান্ড থেকে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া থেকে বোঝা যায় যে, দুটি দূরবর্তী গোষ্ঠীর মধ্যে একটি নেটওয়ার্ক ছিল, যা সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। গবেষকরা মনে করেন উভয় স্থানেই সাংস্কৃতিক মিলের কারণে এ ঐক্য বিদ্যমান ছিল। ব্রিটেনের জনসংখ্যা একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। এ অঞ্চলের প্রথম দিকের কৃষকরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছেন, যারা প্রায় ছয় হাজার বছর আগে এসেছিলেন। তারা সঙ্গে করে কৃষি যন্ত্রপাতিও নিয়ে এসেছেন। তারা শিকারি-সংগ্রাহক সম্প্রদায়ের জায়গা দখল করে। যেসব সম্প্রদায় ৪০০০ থেকে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা ছিল। কিন্তু আনুমানিক ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মানুষ ইউরোপ থেকে ব্রিটেনে আসতে শুরু করে, যা এখন জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস নামে পরিচিত এবং এ সময়েই স্টোনহেঞ্জ পুনর্নির্মিত হয়েছিল। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াটি ছিল নতুন লোকেদের বৈধতা আদায়ের একটি প্রতিক্রিয়া এবং নিওলিথিক কৃষক জনসংখ্যাকে একত্রিত করার চেষ্টা। স্টোনহেঞ্জের উত্তরদিকে অনেক ভাঙা ব্লুস্টোন এবং সারসেন পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হয়, সেখানেই পাথরগুলোকে এনে প্রথমে রাখা হয় এবং যথাযথ আকৃতি প্রদান করা হয়। সেখানে ছোট-বড় অনেক ‘হ্যামারস্টোন’ও পাওয়া যায়। আধুনিক লেজারে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, কিছু পাথরকে বিশেষ করে উত্তর-পূর্বের প্রবেশপথের কাছের পাথরগুলোকে বিশেষভাবে মসৃণ এবং আকৃতি প্রদান করা হয়েছে। তা ছাড়া খাড়া সারসেনগুলোর ওপর অনুভূমিকভাবে পাথরগুলো স্থাপনের জন্য এগুলোর মধ্যে মসৃণ ছিদ্র এবং খাঁজ সৃষ্টি করা হয়।
মিথ
কে নির্মাণ করেছিল স্টোনহেঞ্জ তা নিয়ে রয়েছে অনেক রহস্য। শত শত পৌরাণিক কাহিনি ও কিংবদন্তিও রয়েছে। এটি নির্মাণ করে ছিল গ্রিক, আটলান্টিয়ান ডেন, রোমান, সেক্সন, মিসরীয়, ফিনিসিয়ানরা, এমনকি কেউ কেউ বিশ্বাস করেন এলিয়েনের কথাও। কিছু মানুষের ধারণায় বদ্ধমূল হয়েছে এগুলো ড্রুইডদের বানানো। ড্রুইড হলো প্রাচীন কেল্টিক জাতির একজন ধর্মযাজক। এক শ্রেণির গবেষক মনে করেন, এই ধর্মযাজক বিভিন্ন উৎসর্গমূলক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন। প্রথমে জন অব্রে এবং পরে ড. উইলিয়াম স্টকলি, এই দুই প্রত্নতাত্ত্বিক স্টোনহেঞ্জ নিয়ে গবেষণা করেন। ড. ইউলিয়াম স্টকলির গবেষণা ও প্রচারণায় ড্রুইডরা বিশ্ব জুড়ে স্টোনহেঞ্জের প্রস্তুতকারক হিসেবে খ্যাতি পায়। গবেষণা করতে করতে তিনি কেল্টিকদের সঙ্গে এমনভাবে মেশেন যে, তিনি নিজেও শেষ পর্যন্ত এই ধারণা থেকে বের হতে পারেননি। তবে বেশিদিন টেকেনি উইলিয়ামের মতবাদ বা গবেষণার মূল্যায়ন। আধুনিক রেডিও কার্বন ডেটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে, কেল্টিকরা এ অঞ্চলে আসার এক হাজার বছর আগেই নির্মিত হয়েছিল স্টোনহেঞ্জ। পরে তারা আসার পর এই স্থাপনাকে উপাসনা এবং উৎসর্গের কাজে ব্যবহার করত। আধুনিক ড্রুইডরা এখনো উপাসনার জন্য বছরে একবার গ্রীষ্মকালে স্টোনহেঞ্জে সমবেত হয়। অধিকাংশ বিজ্ঞানী স্টোনহেঞ্জ রহস্য নিয়ে আধুনিক রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতির প্রতিবেদনে বিশ্বাসী। এ হিসাব অনুযায়ী স্টোনহেঞ্জ রহস্য খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছরের পুরনো। প্রথম এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিল নব্যপ্রস্তুর যুগের কৃষিজীবী মানুষরা। দ্বিতীয়বারের মতো এ স্থাপনা নির্মাণে অংশ নিয়েছিল ইউরোপীয় বীকার জাতির লোকেরা। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে সালিসবারি সমভূমির বাসিন্দাদের ওপর আক্রমণ করে বীকার জাতিগোষ্ঠী এখানে বসতি স্থাপন করে। তারা ছিল অত্যন্ত সংগঠিত এবং খুবই মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করত। তাদের কর্মজীবনে গাণিতিক ধারণা ছিল উন্নতমানের। বীকাররা ছিলেন সূর্যের পূজারী।
তৃতীয় পর্যায়ে ওয়েজেক্সের লোকরা স্টোনহেঞ্জ নির্মাণে হাত লাগিয়েছিল। আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্টোনহেঞ্জের সারসেনস নামক পাথরগুলোতে তারাই ব্রোঞ্জের তলোয়ার অঙ্কন করে। দ্বাদশ শতকের লেখক জিওফ্রের তত্ত্বে যদি আপনি বিশ্বাস করতে চান, তাহলে আপনাকে জাদুবিদ্যায় বিশ্বাসী হতে হবে। তার মতে, কোনো এক মার্লিন নামক জাদুকরের জাদুতেই তৈরি হয় স্টোনহেঞ্জ। গল্পটা হচ্ছে এ রকম। রাজা অরেওলেস-এর রাজ্যের শত শত নাগরিককে বর্বর স্যাকসনরা হত্যা করে এবং স্যালিসবুরি সমতল ভূমিতে নিয়ে গণকবর দেয়। পরে সে স্থানে স্টোনহেঞ্জ তৈরি হয়।
