ফেনীতে জনকল্যাণ শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে একটি সংস্থা অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ২ টাকা দামের একটি ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণের ফরম বিক্রি করছে ১ হাজার ১০০ টাকায়। বীমা সুবিধা না থাকলেও ২০০ টাকা করে নেওয়া হয় প্রত্যেক গ্রাহকের কাছ থেকে। ১০ হাজার টাকা ক্ষুদ্র ঋণের জন্য একজন গ্রাহককে প্রথমেই গুনতে হয় ১ হাজার ৩০০ টাকা। ঋণের টাকা পরবর্তী ১০০ দিনের মধ্যে প্রতিদিন ১০০ টাকা হারে জমা দিতে হয়। যদি কোনো কারণে নির্দিষ্ট সময়ে মূল টাকা দিতে অপারগ হয়, তাহলে ফের ১ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া সমিতির একটি ব্রাঞ্চের অনুমোদন থাকলেও ছয় স্থানে চলছে কার্যক্রম। ওই সমিতিতে কর্মরত কয়েকজন চাকরি ছেড়ে দিলেও তাদের বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ও জামানত হিসেবে গৃহীত চেক ফেরত না দিয়ে হামলা-মামলা করে হয়রানি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে সিলোনিয়া ব্রাঞ্চে গিয়ে দেখা যায়, অফিসের সামনে অন্য নামে (জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন ফর ডিসএডভানটেস হিউম্যান) অফিস খুলে ভেতরে জনকল্যাণ শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কাজ চলছে। একইভাবে মহিপাল, কাজিরবাগ, লেমুয়া, টেকনিক্যালে কার্যক্রম চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উল্লিখিত ফাউন্ডেশনের কোনো অনুমোদন নেই। ফেনী পাঠানবাড়ী রোড়ের একটি আবাসিক ভবনের দোতলায় তাদের প্রধান অফিস রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গ্রাহক বলেন, ‘১০ হাজার টাকা ঋণ নিলেও পাচ্ছি ৮ হাজার ৭০০ টাকা। সরকারি ছুটির দিনেও মাপ নেই কিস্তির টাকা। টাকা দিতে দেরি হলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুনতে হয়। ১০ হাজার টাকা নিলে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে গুনতে হয়। এভাবে সমিতি ৩ মাস ১০ দিন পর্যন্ত টাকা নিয়ে থাকে। ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার সময়েও সমিতির লোকরা এসে টাকা নিয়েছে।’
দাগনভূঞার সিলোনিয়া শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক হাসানুল হক ইমন বলেন, ‘গত ১৫ সেপ্টেম্বর সমিতির চাকরি ছাড়ি। চাকরির চুক্তিনামা অনুযায়ী, ১৫ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড, বিগত দেড় মাসের বেতন ও জমা করা তিনটি চেক ফেরত দেয়নি। বিষয়টি ম্যানেজারকে জানালে তারা গালাগাল করে ও হুমকি-ধমকি দেন। সর্বশেষ আমার নামে কোর্টে মামলা করে হয়রানি করছে। এ ব্যাপারে আমি ফেনী মডেল থানা ও দাগনভূঞা থানায় অভিযোগ করেও কোনো ফল পাইনি।’
সমিতির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিয়া সুলতানা প্রীতি জানান, জনকল্যাণ শ্রমজীবী সমবায় সমিতিতে ৭ হাজার ৮০৭ সদস্য রয়েছেন। এর মাধ্যমে ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি সদস্য ফরমের মূল্য ৫০ টাকা।
সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল হালিম বলেন, ‘সমিতির সদস্যদের ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণের শুরুতে যে ১ হাজার ১০০ টাকা ফরম বিক্রি এবং ২০০ টাকা বীমা করার জন্য নেওয়া হয়, সেটা সমিতির লভ্যাংশ হিসাবে ধরা হয়।’ সমিতির অন্যান্য শাখাকে তিনি নিজের ব্যবসায়িক কার্যালয় বলে জানান।
আবদুল্লাহ আল হালিমের মতে, সরকারিভাবে তারা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত লাভ নিতে পারেন। তবে তিনি ১০০ দিনে ১৩ শতাংশ নিচ্ছেন। তবে হিসাব করে দেখা যায়, ১০০ দিনে ১৩ শতাংশ হলেও বছরে তিনি ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ বা সুদ নিচ্ছেন।
ফেনী সদর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘জনকল্যাণ শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কার্যক্রম তদন্ত করার জন্য আদালত থেকে একটি প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। আমরা অভিযোগগুলো তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আল-আমিন বলেন, ‘সমবায় সমিতির আইন না মেনে কোনো কার্যক্রম করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সমিতির লাইসেন্স বাতিল করা হবে।’
