নবীজিকে ভালোবেসে দরুদ পাঠ

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:২৩ এএম

নবীজিকে যারা ভালোবাসে তারা বেশি বেশি নবীজিকে স্মরণ করে। আর ব্যাপকভাবে লোক সমাগম করে নবীজিকে স্মরণের অন্যতম বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন পদ্ধতি হলো সিরাত মাহফিল বা তার জীবনী নিয়ে আলোচনা সভা। আরেকটি মর্যাদাসম্পন্ন পদ্ধতি হলো তার প্রতি দরুদ পাঠ করা। দরুদ ফারসি শব্দ। এর অর্থ কল্যাণ প্রার্থনা। ইসলামের পরিভাষায় দরুদ বলতে বোঝায় নবীজি (সা.)-এর প্রতি দোয়া। যেমন নবীজির নাম উচ্চারণের সময় ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা অর্থাৎ তার ওপর মহান আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক। এটি একটি দরুদ।

মহান আল্লাহর কাছে ইবাদত-বন্দেগি গ্রহণযোগ্য করতে পরম ভক্তি ও ভালোবাসা ভরা অন্তরে নিবিষ্টভাবে নবী (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা উচ্চ পর্যায়ের নেক আমল। দোয়া কবুলের জন্য মহানবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। দরুদ শরিফ পাঠ করলে মহান আল্লাহর দরবারে ইবাদতের বিনিময় সুনিশ্চিত হয়। দরুদ পড়া এমন এক ইবাদত, যা মহান আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর জন্য সালাত (দরুদ) পাঠ করেন। হে ইমানদাররা! তোমরাও নবীর জন্য সালাত ও সালাম (দরুদ) পাঠ করো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত ৫৬) এ আয়াত ছাড়া কোরআন-হাদিসের আরও অনেক জায়গায় ‘সালাত’শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সাালাত শব্দ দুটি ইবাদত বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমটি হলো, নামাজ। আর দ্বিতীয়টি হলো, নবীজির প্রতি দরুদ পাঠ করা। আলেমরা বলেন, ‘আল্লাহর ক্ষেত্রে সালাতের অর্থ ফেরেশতাদের সামনে নবীজির প্রশংসা করা। ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে সালাতের অর্থ দোয়া করা।’ আর উম্মতদের পক্ষ থেকে সালাতের অর্থ হলো নবীজির জন্য মাকামে মাহমুদের দোয়া করা।

দরুদ শরিফ পড়ার ফজিলত অনেক। একদিন এক লোক হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে নামাজ পড়ে দোয়ার জন্য হাত তুলে বলতে শুরু করল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহ মাফ করো এবং আমার ওপর রহম করো!’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘ওহে মুসল্লি! তুমি খুব তাড়াহুড়া করেছ। শোনো, যখন তুমি নামাজ পড়বে, তখন প্রথমে আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করবে, তারপর আমার ওপর দরুদ পাঠ করবে এবং সবশেষে নিজের জন্য দোয়া করবে।’ (সুনানে তিরমিজি ও আবু দাউদ)

শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে দরুদ শরিফ পড়লে বান্দার গুনাহ মাফ হয়। দরুদ পাঠের অশেষ সওয়াব সম্পর্কে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর মাত্র একবার দরুদ পাঠ করে, মহান আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত নাজিল করেন এবং কমপক্ষে তার ১০টি গুনাহ মাফ করেন। তার আমলনামায় ১০টি সওয়াব লেখা হয় এবং আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা ১০ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়।’ (সুনানে নাসায়ি) হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তির নাক মাটিতে মিশে যাক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয় অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ে না।’ (সুনানে তিরমিজি) হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে, যে ব্যক্তি আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ে।’ (সুনানে তিরমিজি)

হাদিস শরিফে আরও চমৎকার বর্ণনা এসেছে। যারা নবীজির ওপর দরুদ শরিফ পড়ে তাদের দরুদ নবীজির কাছে পৌঁছানো হয়। আউশ ইবনে আউশ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমার দিন। ওই দিন তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়। কেননা, তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়। সাহাবিরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার যখন ওফাত হয়ে যাবে, আমাদের দরুদ কীভাবে আপনার কাছে পেশ করা হবে? জবাবে রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহ পয়গম্বরদের দেহসমূহকে খেয়ে ফেলা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ)

রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করার মাধ্যমে দুশ্চিন্তা দূর হয় এবং পাপ মোচন হয়। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার ওপর অনেক বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করি। আপনি আমাকে বলে দিন, আমি (দোয়ার জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ করে রেখেছি তার) কতটুকু সময় আপনার ওপর দরুদ প্রেরণের জন্য নির্দিষ্ট করব? জবাবে নবী কারিম (সা.) বলেন, তোমার মন যা চায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি এক-তৃতীয়াংশ করি? নবী কারিম (সা.) বলেন, তোমার মন যা চায়। যদি আরও বেশি করো, তাহলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি অর্ধেক সময় নির্ধারণ করি? নবী কারিম (সা.) বলেন, তোমার মন যা চায়। যদি আরও বেশি নির্ধারণ করো, তাহলে তা তোমার জন্যই ভালো। আমি বললাম, যদি দুই-তৃতীয়াংশ করি। নবী কারিম (সা.) বলেন, তোমার মন যা চায়। যদি আরও বেশি নির্ধারণ করো তা তোমার জন্যই কল্যাণকর হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে আমি আমার (দোয়ার) সবটুকু সময়ই আপনার ওপর দরুদ পাঠ করার জন্য নির্দিষ্ট করে দেব? নবী কারিম (সা.) বলেন, তাহলে তোমার চিন্তা ও ক্লেশের (চিন্তা ও ক্লেশ দূর করার) জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ মাফ করা হবে। (তিরমিজি)

আমরা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত। তার সুপারিশ ছাড়া আমাদের কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। আর নবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করলে পরকালে তার সুপারিশ নসিব হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। সুতরাং মহান আল্লাহর কাছে আমাদের ইবাদত-বন্দেগি কবুল হওয়ার জন্য এবং পরকালে রাসুল (সা.)-এর সুপারিশ লাভ করার জন্য আমাদের বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত