ভারতীয় রাজনীতির পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব মনমোহন সিং

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:০৫ এএম

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওয়ের প্রয়াণের পর প্রণব মুখোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল— রাওয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কী বলে আপনার মনে হয়? প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ‘মনমোহন সিংহকে আবিষ্কার।’ 

ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস বলছে, এখনও পর্যন্ত জওহরলাল নেহেরু এবং ইন্দিরা গান্ধীর পরে মনমোহনই দীর্ঘতম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০১৪। একটানা ১০ বছর। তা ছাড়া, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত নরসিংহ রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে দেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। সামলেছেন রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর, যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান, রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতার পদও।

দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে শরণার্থী হয়ে চলে আসেন ভারতে। কৃতী ছাত্র, নামী শিক্ষক, উচ্চপদে নানা চাকরি থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে উঠে আসা— সব মিলিয়ে মনমোহনের জীবন এক চমকপ্রদ উত্থানের কাহিনি। তবে মনমোহন সিংহ নামটা দেশ তথা বিশ্বের সামনে সজোরে এসে পড়ে ১৯৯১ সালে, তিনি দেশের অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর।

রাওয়ের জমানায় অর্থমন্ত্রী হিসাবে দেশের আর্থিক সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছে মনমোহনের নাম। অর্থনীতির সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পুরোদস্তুর সরকারি নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে বেসরকারি পুঁজি, ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশি পুঁজিকেও জায়গা করে দেওয়ার রাস্তা তৈরি হয়েছিল মনমোহনের হাতে। পাঁচ বছর অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন তুমুল বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। এক দিকে প্রবল নিন্দা আর প্রতিবাদ, অন্য দিকে দু’হাত তুলে প্রশংসা আর সমর্থন।

অর্থমন্ত্রী মনমোহনের নীতি সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে বামপন্থীদের। আবার সেই বামদের সমর্থনেই কিন্তু ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তবে সেই ‘মধুচন্দ্রিমা’ প্রথম ইউপিএ সরকারের শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০০৮ সালে ভারত-আমেরিকা পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করে বামরা। বামেদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি সইয়ের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন মনমোহন। তার সরকারের উপর থেকে বামরা সমর্থন তুলে নেয়। যদিও আস্থাভোটে জিতে টিকে যায় তার সরকার।

‘নরম’ বা ‘দুর্বল’ মনমোহনের এই কঠোর সিদ্ধান্ত দেশ কিন্তু একাধিক বার প্রত্যক্ষ করেছে। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের শরিক তৃণমূলের সমর্থন প্রত্যাহারের পরেও খুচরা ব্যবসায় বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খোলার সিদ্ধান্তে অবিচল থেকেছেন তিনি। প্রথম এবং দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এমন বেশ কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সরকার।

ভারতের ইতিহাসে মনমোহনই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি আগে নিজের অবসরের কথা ঘোষণা করেছিলেন। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের পাঁচ মাস আগে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভোটের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তিনি আর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকবেন না।মনমোহনের ব্যক্তিগত সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনও দিন প্রশ্ন তোলার সুযোগ পায়নি বিরোধীরা। তার জীবনাবসানে ভারত হারাল এক বিরল ভদ্র, শিক্ষিত এবং নম্র রাজনীতিককে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত