পাঠক আজ যার কথা জানবেন তিনি হলেন বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় বিউটি কনটেন্ট সাইট ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘সাজগোজ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান কনটেন্ট অফিসার সিনথিয়া শারমিন ইসলাম। যিনি ফার্মেসি বিষয়ে পড়াশোনা করেও পড়াশোনাভিত্তিক পেশা বেছে নেননি। বেছে নিয়েছেন সৌন্দর্যবিষয়ক সচেতনতার জন্য কনটেন্ট তৈরি ও সৌন্দর্য প্রসাধন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব। শীতের এক সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে প্রাণ খুলে আড্ডা দিলেন মোহসীনা লাইজুর সঙ্গে
যেভাবে শুরু হলো
২০১০ সালের শেষের দিকে প্রকৌশলী স্বামী নাজমুল শেখের কর্মস্থল নাইজেরিয়ার লাগোস শহরে পাড়ি জমান সিনথিয়া শারমিন ইসলাম। কাজ নিলেন সেখানকার কমিউনিটি ফার্মেসিতে। কাজের প্রসঙ্গে সিনথিয়া জানালেন, কাজ করার সময় দেখতে পেলাম নাইজেরিয়ার মানুষ বাংলাদেশের মানুষের মতো এত ওষুধ কেনে না। কোনো নাইজেরিয়ানকে ওষুধ দিলে তারা জানতে চায় ওই বিশেষ ওষুধটি কেন তাকে দেওয়া হয়েছে। কোনো ক্রিম দেওয়া হলে জানতে চায় গায়ের রঙ বা ত্বকের ধরনের তারতম্যের জন্য ক্রিমের প্রকারভেদ হয় কি না। গায়ের রঙ ফর্সা করার মতো কোনো ক্রিম আছে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি।
সিনথিয়ার কাজ ছিল ফার্মাসিস্ট হিসেবে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। এ প্রসঙ্গে সিনথিয়া বলেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য গুগলের কিংবা বইয়ের দারস্থ হতাম। একটা সময় গুগলে সার্চ করতে গিয়ে দেখতে পেলাম, সৌন্দর্যচর্চার এবং সেলফ কেয়ার-সংক্রান্ত তেমন কোনো বাংলা ওয়েবসাইট নেই। বুঝলাম, চিকিৎসককে কোনো ওষুধ সম্পর্কে প্রশ্ন করার সংস্কৃতিই আমাদের দেশে নেই। সেলফ কেয়ার করা মানে মাসে একবার সেলুনে বা বিউটি পার্লারে যাওয়া। তা-ও আবার বেশি বয়সীদের সৌন্দর্যচর্চা সে আবার কী। চুল বা ত্বকের ধরন অনুযায়ী আলাদা আলাদা শ্যাম্পু ও লোশন আছে এটা কজন মেয়ে জানেন। নিজের সুস্থতার জন্য আলাদা সাবান-শ্যাম্পুর বাইরে আলাদা করেও যতœ নিতে হয়। আমার হাসবেন্ডের পরামর্শে ও অভয়ে শুরু করলাম লেখালেখি। আমার লেখা দিয়েই যাত্রা শুরু করল সৌন্দর্যচর্চার নানা বিষয় নিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম ওয়েবসাইট সাজগোজ ডটকম। সময়টা ছিল ২০১৩। বিদেশের মাটিতে বসেই কাজটা শুরু করেছি। চাকরি ছেড়ে এমন কাজ করব এ ব্যাপারে পরিবারের লোকজনের খুব একটা সায় ছিল না। এরপর দেশে ফিরে পুরোদমে কাজ শুরু হলো আমাদের। সঙ্গে যোগ হলেন আরেক প্রকৌশলী বন্ধু মিলকি মাহমুদ। দুই টেলিকম প্রকৌশলী ও আরেক ফার্মাসিস্টের হাত ধরে সাজগোজ ডটকম এরই মধ্যে পাড়ি দিয়েছে ১২ বছর।
কাজের বিস্তৃতি
দেশে ফিরে ২০১৫ সালে যমুনা ফিউচার পার্কে সাজগোজ-এর প্রথম আউটলেট চালু করেন। এখন ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ মোট ৯টি আউটলেট। অনলাইন পেমেন্ট, ক্যাশঅন ডেলিভারির বিষয়টা যখন মানুষ বুঝতে পারল সেই প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে ই-কমার্সের প্রয়োজনীয়তা ও ক্রেতাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সাজগোজ’কে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন। সাজগোজ সারা দেশে মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায় মূলত করোনা সংক্রমণের সময়টাতে। সবকিছু বন্ধ, মানুষ ঘরে বসে ছিল। তখন অনলাইনে অনেক সময়ও কাটাত। এভাবে সাজগোজ অনেকটা এগিয়ে যায়।
কাজ নিয়ে সিনথিয়া বলেন, ‘শত ব্যস্ততার মধ্যেও যখন সময় মেলে, তখন আউটলেটে চলে যাই ক্রেতার চাহিদা বুঝতে। জানতে চেষ্টা করি তাদের চাহিদা, অজ্ঞতা আর বিভিন্ন সমস্যা। আমি দেখেছি, গর্ভবতী নারীদের মধ্যে সৌন্দর্যচর্চার ব্যাপারে অনেক ভুল ধারণা কাজ করে। একটু বয়সীরা ‘মেকওভার’ আর ‘সেলফ কেয়ারের’ পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেন। অথচ তখন আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। ত্বকের যত্ন মানেই রঙ ফর্সাকারী ক্রিম না। সেলফ কেয়ারের জন্য যা যা প্রয়োজন শুরুতে লিখলাম। তারপর পরিচিত করাতে চেষ্টা করেছি প্রয়োজনীয় প্রসাধনের সঙ্গে। সুস্থ ও সতেজ ত্বকের জন্য কয় ধাপে যত্ন নিতে হবে তা নিয়েই লিখেছি ৫০টির মতো লেখা। এখন সাজগোজ সাইটে কনটেন্টই আছে ৯ হাজারের বেশি আর ভিডিও টিউটোরিয়াল আছে ৩ শতাধিক।’
শুরু থেকেই ক্রেতাদের ব্যক্তিগত পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করেছেন। শুধু পণ্য বিক্রিই উদ্দেশ্য ছিল না, ব্যক্তিগত পছন্দের পাশাপাশি ত্বক ও চুলের ধরন অনুযায়ী কোন পণ্যটি ব্যবহার করা উচিত, সেই ব্যাপারে টিউটোরিয়াল বা বিউটি টিপসের মাধ্যমে ক্রেতাদের সচেতন করেছেন। সিনথিয়া আরও বলেন, ‘কাস্টমার-ফার্স্ট’ বিজনেস মডেলই সাজগোজ’কে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। একজন নারী বা পুরুষের জন্য পার্সোনাল কেয়ার কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এটি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসের জন্যও জরুরি। সাজগোজ-এর লক্ষ্য ক্লায়েন্টদের আত্মবিশ্বাসী ও সচেতন করতে সাহায্য করা। তাদের অনুপ্রাণিত করা। এর ধারাবাহিকতায় সাজগোজ-এর রিপিট ক্রেতা ৭০ পারসেন্ট। এর মধ্যে ৬০ পারসেন্ট ক্রেতা নারী। আমি মনে করি নারী ক্রেতারা খুব বিশ্বাসী হন। একজন আস্থাশীল ক্রেতাই নতুন ক্রেতা এনে দেন। আপনি যদি নিজেকে ভালোবাসেন ও আত্মবিশ্বাসী হন, তাহলে সেটি আপনার জীবনেও বিভিন্নভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর তাই পণ্য নির্বাচন থেকে শুরু করে কনটেন্ট তৈরি সাজগোজ পরিচালনার সব ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসই মূলমন্ত্র।’
যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন
সাজগোজ-এর বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে ক্রেতাদের পছন্দের টপ-কোয়ালিটি পণ্যগুলো বিশেষ ছাড়ে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন। ব্যবসার বোঝাপড়া নিয়ে সিনথিয়া জানান, ক্রেতাদের সঙ্গে সাজগোজ-এর সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে, একই সঙ্গে তাদের মধ্যে নতুন নতুন বিউটি পণ্য নিয়ে আগ্রহ তৈরি হবে। নিজেদের সচেতন করতে উৎসাহ বোধ করবে। সাজগোজ-এর ক্রেতাদের সঙ্গে বোঝাপড়াটা ১০ বছরের। দেশে পণ্য তৈরি করতে হলে অবকাঠামোগত অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে। লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন এসব তৈরি করতে গেলে যে ম্যাটেরিয়াল দরকার সেটাও বিদেশ থেকে আনতে হবে। এগুলো তৈরি করতে এক্সপার্ট দরকার। এক্সপার্টদেরও বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হবে। সবকিছুই সময়সাপেক্ষ। তবে আমি আশাবাদী। যেহেতু বিউটি ইন্ডাস্ট্রিটা দিন দিন বড় হচ্ছে সেহেতু ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ নিয়ে প্রসাধনী বাজারে আসবে এটাই স্বাভাবিক।’ এরই মধ্যে সাজগোজ নিজেদেরও ৭টি ব্র্যান্ড তৈরি করেছে। যা বিদেশ থেকে তৈরি করে নিয়ে আসা হয়। যেমন স্কিন ক্যাফে, নিরভানা, রাজকন্যা এগুলো তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড। সাজগোজ-এর তালিকায় আছে চার হাজারের বেশি পণ্য। লরিয়াল ও রেভলনের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও তাদের তালিকায় আছে।
আগামীতে সাজগোজ
সৌন্দর্যের চাহিদা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। সাজগোজ বিভিন্ন ত্বক ও চুলের ধরনের পাশাপাশি ব্রণ, এইজিং ইত্যাদি সমস্যা বিবেচনা করে সঠিক পরামর্শ ও নির্বাচিত পণ্য রিকমেন্ড করে। এ প্রসঙ্গে সিনথিয়া বলেন, সাজগোজ-এর তালিকায় বিভিন্ন রেঞ্জের পণ্য আছে, ফলে সবাই তাদের চাহিদামতো পণ্য কেনার সুযোগ পান। বিউটিশিয়ান ও বিউটি এক্সপার্টরা বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ দিচ্ছেন।
প্রযুক্তিময় জীবনে এআই’র ব্যবহার বাড়ছে দিন দিন। সাজগোজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো ক্রেতাদের কেনাকাটাকে আরও সহজ করতে এআই-ভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া এবং পণ্যের পরিসর বাড়িয়ে পরিবেশবান্ধব ও দেশীয় পণ্য যুক্ত করা। এ ছাড়া আগামীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাজগোজ-এর নতুন আউটলেট চালু করে ক্রেতাদের আরও কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও আছে।
সিনথিয়া বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জনটি হলো সাধারণ কনটেন্ট ব্লগিং সাইট থেকে সবার ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হওয়া। এ পর্যন্ত আমরা ১০ লাখেরও বেশি গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি, যাদের মধ্যে ৭০ শতাংশই আমাদের রিপিট কাস্টমার। এ ছাড়া আইসিটি অ্যাওয়ার্ড ও দ্য ডেইলি স্টার-এর স্বীকৃতি ইত্যাদি সবই আমাদের অগ্রগতিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
সৌন্দর্যবিষয়ক নিবন্ধ, পরামর্শ টিপস নিয়ে লেখা ছাড়াও এ সংক্রান্ত ভিডিওর এক বড় তথ্যভান্ডার হয়ে উঠেছে এখন সাজগোজ।
সেলফ কেয়ার নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলছেন তারা। মাসে ছয় লাখের বেশি পেজ ভিউ, ফেসবুকে ১৭ লাখ অর্গানিক অনুসারী, ৯ হাজারের বেশি লেখা এবং ৩ শতাধিক ভিডিও নিয়ে গ্রাহকের সঙ্গে সাজগোজ-এর চলছে পথচলা।
ইন্টারনেটের বাংলায় লেখা বা ভিডিও শুধু নয়, পাশাপাশি সৌন্দর্যবিষয়ক পরামর্শ প্রদান এবং সেলফ কেয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের আরও বিকশিত করার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যেতে চান সিনথিয়া ইসলাম। সাজগোজ পরিবার এখন ৮০০ জনের। বলা যায় সাজগোজ মূলত নারী কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠান।
নতুন বছরে সাজগোজ তার গ্রাহককে আরও একটি সুখবর দিতে যাচ্ছে, তাহলো তাদের পণ্যের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে জুয়েলারি। খুব শিগগিরই বাজারে আসবে, অপেক্ষায় থাকুন সাজগোজের ক্রেতারা। আড্ডার শেষে স্বপ্নচারী সিনথিয়া ইসলাম আরও বলেন, আজকের টিনএজ এবং আগামীর নারীর কাছে সাজগোজ আছে ও থাকবে।
