ঐতিহ্যের স্মারক দেয়াঙ পাহাড়ের জমিদারবাড়ি

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:৫১ এএম

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান মিয়াবাড়ি নামে পরিচিত জমিদার বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা রাজা শ্যাম রায়। ৩০০ বছরের বেশি পুরনো এই বাড়িটি প্রায় ৭০ বছর ধরে পরিত্যক্ত। বাড়ির পেছনে ঝোপঝাড় আর ভবনের গায়ে লতা-গুল্ম জন্মেছে। অথচ ইট-সুরকির গাঁথুনিতে পুরু দেয়ালের দোতলা বাড়িটিতে এক সময় আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেত। জমিদার, তার পুত্র-কন্যা, পাইক-পেয়াদা মুখর করে রাখতেন বাড়িটি। উপমহাদেশের অনেক বিখ্যাত শিল্পী এই বাড়িতে এসে গান করেছেন। রাজা শ্যাম রায়ের পরগনার নাম ছিল দেয়াঙ পরগনা। দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশে এই মিয়াবাড়ির অবস্থান।

মিয়াবাড়ির প্রবেশমুখে বড় একটি পুকুর। পুকুরে দুটি ঘাটলা রয়েছে। ভাঙাচোরা ঘাটলা দুটির মধ্যে একটি সংস্কার করা হয়। পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশেই আছে পারিবারিক মসজিদ ও কবরস্থান। সেই আমলে নির্মিত মসজিদটির কারুকাজ চোখে পড়ার মতো। মসজিদটির পাশের কবরস্থানে শায়িত আছেন জমিদারের বংশধররা। জমিদারবাড়ির প্রবেশপথে ছিল একটি কাছারিঘর। সেটি এখন ভেঙে গেছে। জমিদারবাড়ির দোতলা ভবনের নিচে ও ওপরে তিনটি করে কক্ষ আছে। ইট, সুরকি ও রড দিয়ে তৈরি করা হয় ভবনটি। দেয়াঙ পাহাড়ের মাটি দিয়ে ইটগুলো তৈরি করা হয়। সঙ্গে চুন-সুরকির মিশেলে নির্মিত হয় স্থাপনাটি। পাশেই বিনোদনের জলসাঘর। ছিল ধান রাখার জন্য বিশাল গোলা। এখন আর জমিদারবাড়ির সেই জৌলুস নেই। এটি এখন কেবলই একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। 

গবেষক জামালউদ্দিনের লেখা বই দেয়াঙ পরগনার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬৯৪-৯৬ সালে এই স্থানে বসবাস শুরু করেন জমিদারের বংশধররা। আনুমানিক ১৭০০ সালের দিকে এই জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তন। সে হিসাবে পরিবারটির বয়স ৩২৫ বছরের ওপরে। জমিদার দেওয়ান রাজা শ্যাম রায়ের মাধ্যমে এ বংশের জমিদারি শুরু হয়। বাংলার নবাব শায়েস্তা খানের কাছ থেকে তিনি জমিদারি লাভ করেন। নবাব শায়েস্তা খান যখন চট্টগ্রাম জয় করেন, তখন তার প্রধান সেনাপতি ছিলেন বড় ছেলে বুজুর্গ উমেদ খান। উমেদ খানের সহযোগী সেনাধ্যক্ষ ছিলেন রাজা শ্যাম রায়। পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে দেওয়ান মনোহর আলী খান নামে পরিচিতি পান।

দেওয়ান মনোহর আলী খান বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা শুরু করলে শায়েস্তা খান নিজের মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। এই বিয়ের মধ্য দিয়ে নবাব শায়েস্তা খান তার জমিদারির এক-চতুর্থাংশ মনোহর আলী খানকে দান করেছিলেন। তার বংশধরদের জমিদারি পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ছেড়ে হাতিয়া-নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হয়। খাজনা আদায়ের সময় ভারতবর্ষের সেরা শিল্পী, বাদক দল মাতিয়ে রাখতেন এ বাড়ি। বছর জুড়ে থাকত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তাদের অধীনে চট্টগ্রামে ছিল অনেক ছোট ছোট জমিদার। এই জমিদারের বংশধররা তাদের বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজের সুবিধার জন্য কাজী, মুহুরি, সিকদার, নাপিত, ধোপা, কামার-কুমারসহ অনেক পেশাজীবী কর্মচারী রাখতেন। সবাই জমিদারবাড়িতে বাস করতেন।

এই পরিবারের সদস্যরা ছিলেন ধর্মভীরু। চট্টগ্রাম জুড়ে একাধিক ঐতিহাসিক মসজিদ, দিঘি, সড়ক, হাটবাজারসহ বহু জনহিতকর প্রতিষ্ঠান তারা তৈরি করেছেন। যা এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নবাব শায়েস্তা খানের আমল থেকে ১৯তম বংশধর পর্যন্ত জমিদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে ষাটের দশক থেকে জমিদারের বংশধররা এখানে বসবাস বন্ধ করে দেন। তখন থেকে জমিদারবাড়ির স্থাপনা অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হতে থাকে।

এলাকাবাসী বলছেন দেশের পুরনো ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে বড়উঠান মিয়াবাড়িটি রাষ্ট্রীয়ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে বাড়িটি সংস্কার করলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে।

জমিদার মনোহর আলী খানের বংশধর সাজ্জাদ আলী খান মিঠু সপরিবারে থাকেন চট্টগ্রাম শহরে। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে গ্রামে যান। তিনি বলেন, ‘জমিদারবাড়িটি সংস্কার করা খুবই প্রয়োজন যাতে করে আগামী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জমিদারবাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে।’

চট্টগ্রাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের উপপরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেয়াঙ পাহাড়ের বড়উঠান বিশ্বমুড়া নামক স্থানে পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষের খোঁজে খনন ও অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা করি। ওই সময় আমরা বড়উঠানের জমিদারবাড়ি পরিদর্শন করি। বাড়িটি সম্ভবত ৭০-৭৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত। এটি নিঃসন্দেহে ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য সংস্কার জরুরি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত