হিমালয়ের বদলে দ.এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হবে বঙ্গোপসাগর

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:১২ এএম

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন হচ্ছে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় রকমের পরিবর্তন হবে। দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু আর হিমালয় নয়, কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বঙ্গোপসাগর। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে কোনো নেতা নেই, যিনি বঙ্গোপসাগরে বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয়ভাবে নেতৃত্ব দান করতে পারবেন। সরকার এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব দিতে পারে। সেই নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

রাজধানী ফার্মগেটের খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন শীর্ষক দুদিনের জাতীয় সংলাপের দ্বিতীয় দিন গতকাল শনিবার এক অধিবেশনে এ কথা বলেন তিনি। ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ এ সংলাপের আয়োজন করেছে।

অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রতিবেশী আসতে পারে, নতুন রাষ্ট্রের উত্থান হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত যে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে, ভূরাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেবে।’ দেশের স্বার্থে সবাইকের ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংস্কার ও নির্বাচনকে পাল্টাপাল্টি না বলে ন্যূনতম ঐক্যের দিকে যেতে হবে।

অর্থনীতি মন্দা অবস্থায় আছে উল্লেখ করে অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, ‘অর্থনীতির উৎপাদন সম্পর্কে কোনো কথাবার্তা নেই। সেটা আসলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কায়দায় চলবে না, অন্য কোনো কায়দাও চলবে না। দেশজ কায়দা চলতে হলে দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাবে। কিন্তু সামগ্রিক সংস্কার করা যাবে না। সরকারের একটাই লক্ষ্য থাকতে হবে, দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। চার-পাঁচটা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।’ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অনুমোদন দেওয়া ১২ ব্যাংকের স্পনসর কোথা থেকে পেয়েছে, তা বের করা এনবিআরের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংলাপে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাখা যায় কি না, তা সংবিধান সংস্কার কমিটিকে ভাবতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধান রচনার সময় শেখ মুজিবও কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেননি। সংবিধান নতুন করে রচনার সময় এ অঞ্চলের ধর্মীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে।’ দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দেন তিনি।

জাতীয় নাগরিক কমিটির সরোয়ার তুষার বলেন, ‘৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের যে সংবিধান তা বাতিল হয়ে গেছে বলা যায়, এ সংবিধান এখন কোমায় চলে গেছে। সংবিধান পরিবর্তন করার লক্ষ্যে একটি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, গঠন করতে হবে একটি গণপরিষদ। এ গণপরিষদ সংবিধান রচনা করবে নতুন করে। এই গণপরিষদ পরে আইনসভা বা জাতীয় সংসদে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজনে গণভোট করা যেতে পারে।

তবে তুষারের কথার বিরোধিতা করে ছাত্রদলের গবেষণা সেলের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবীব বলেন, ‘যে সংবিধানের ১০৪ ধারা মতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে, আপনারা শপথ নিয়েছেন, তা এত সহজে বাতিল করে দেবেন? সংবিধান সংস্কার করতে গেলে প্রয়োজন গণভোট। থাকতে হবে জনগণের ভাষ্য। জনগণের কথা বলবেন, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। জনগণের প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে কেবল ১০-১২ জনের পাঠচক্রে সংবিধান সংস্কার করে ফেলবেন?’

দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিনের সঞ্চালনায় সংলাপে অংশ নেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, গণফোরামের কো-চেয়ারম্যান সুব্রত চৌধুরী, গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরাজী, গণসংগীত আন্দোলনের আবুল হাসান রুবেল প্রমুখ।

‘দ্বিকক্ষ সংসদ হলে তত্ত্বাবধায়কের প্রয়োজন পড়বে না’ : দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ হতেই হবে বলে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘সেখানে যারা আসবেন তারা নির্বাচন নিয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি করতে পারে। তখন হয়তো আলাদা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন পড়বে না।’ গতকাল কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে জাতীয় সংলাপে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

২০০৭ সালের সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে এই উপদেষ্টা বলেন, ‘তখন আমরা অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সরকার এসে সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এখন সংস্কার না করলে তা আর কখনো হবে না। এ জন্য ন্যূনতম সময় দিতে হবে এবং সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা একটি কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছি।’

‘বিজয় নস্যাৎ হতে দেওয়া যাবে না’ : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে জনতার বিজয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেহাত হয়ে গেছে। তবে চব্বিশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় নস্যাৎ হতে দেওয়া যাবে না।’ গতকাল ঐক্য, সংস্কার, নির্বাচন শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান আলোচকের বক্তব্য তিনি এ কথা বলেন।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় ধরে রাখতে সবার সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। কিন্তু চাই চাই করে গেলে আমরা সব হারাব এবং পরে আক্ষেপ করব। বিজয় ধরে রাখতে তাই সবার সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত