বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি ঘটনাবহুল বছর ২০২৪ সাল। একের পর এক সংঘাত, ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচনের ডামাডোল, রেকর্ড তাপমাত্রা সব মিলিয়ে ২০২৪ সালকে বলা যেতে পারে উত্তাপ ছড়ানোর বছর। এক রকম টানটান উত্তেজনায় পার হয়েছে বছরটি। এ বছরের বেশ কিছু ঘটনা উঠে এসেছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দেখে নেওয়া যাক তেমনই কিছু ঘটনা।
জিমি কার্টারের মৃত্যু
গত ২৯ ডিসেম্বর মারা গেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। তার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর।
জিমি কার্টার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী প্রেসিডেন্ট। গত কয়েক বছর ধরে ত্বকের ক্যানসার মেলানোমাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত জিমি কার্টার ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটের মধ্যেই তাকে কাজ করতে হয়েছিল।
জনপ্রিয়তা হারিয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের সুনাম ফিরে পান জিমি কার্টার। এই কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
বাশার আল আসাদের পতন
গত ৮ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। এর ফলে আসাদ পরিবারের টানা ৫৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের অতর্কিত অভিযান ও একের পর এক শহর দখলের মুখে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন বাশার আল আসাদ।
১৯৭০ এর দশকে সিরিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে আসাদ পরিবার। ১৯৭১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন হাফিজ আল আসাদ। ২০০০ সালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ওই বছরই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তার ছেলে বাশার আল আসাদ। এরপর থেকে টানা দুই যুগ দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।
বাশার আল আসাদ ছিলেন চোখের ডাক্তার। চিকিৎসক হয়ে মানুষের মানবিক সেবাই ছিল বাশারের লক্ষ্য। তবে ১৯৯৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় বড় ভাই বাসিলের মৃত্যুর কারণে রাজনীতিতে যুক্ত হতে হয় তাকে। ২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে দেশের শাসনভার নিজের কাঁধে তুলে নেন।
শাসনামলের শুরুর দিকে বাশার সংস্কারের ভূমিকা রাখেন। প্রশাসনিক-রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথে হাঁটেন। এ ক্ষেত্রে বাবার আমলের বেশ কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন তিনি। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই বদলে যায়। সংস্কারকের ভূমিকা থেকে আসাদ কর্তৃত্ববাদী শাসক হয়ে উঠতে শুরু করেন। বিরোধী মত দমনে তার কুখ্যাতি ছড়াতে থাকে। সিরিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয় অনেক সরকারবিরোধী শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীকে। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমা গণতন্ত্র সিরিয়ার জন্য নয়।’
বাশার ক্ষমতা নেওয়ার আগে থেকেই সিরিয়ার তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ও বাক্স্বাধীনতার অভাববোধ থেকে তুমুল হতাশা ছিল, যা উসকে দেয় আরব বসন্ত। ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ার দক্ষিণের শহর দেরাতে প্রথম সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ দমাতে সরকারি বাহিনীকে মাঠে নামান বাশার। ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে বিক্ষোভকারীরা বাশারের পদত্যাগের দাবি তোলেন। এতে বেড়ে যায় দমন-পীড়ন। সেই সঙ্গে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো সিরিয়ায়।
টানা ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে ধন-মান-ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিতে সমৃদ্ধ দেশ বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসের ভয়াবহতম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশটিকে। দীর্ঘ এই গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ।
অ্যালেক্সি নাভালনির মৃত্যু
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তার এই মৃত্যু কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমালোচক ছিলেন নাভালনি। রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক জানায়, কারাগারে হঠাৎ নাভালনি অসুস্থ বোধ করেন এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর তাকে সুস্থ করার সব চেষ্টা করা হলেও তাতে কোনো ফল আসেনি।
নাভালনিকে সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে (ইয়ামালিয়ার ৩ নম্বর পেনাল কলোনি) বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। নাভালনিকে পুতিনের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হত। ২০২১ সাল থেকে তিনি কারাবন্দি ছিলেন। উগ্রপন্থায় উসকানি ও অর্থায়ন এবং একটি উগ্রপন্থি সংগঠন প্রতিষ্ঠার দায়ে নাভালনিকে ২০২৩ সালের আগস্টে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেয় রাশিয়ার আদালত। এরই মধ্যে তিনি প্রতারণা ও অন্যান্য অভিযোগের দায়ে সাড়ে ১১ বছর কারাভোগ করেন। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন নাভালনি।
প্রথমবার ইসরায়েলে ইরানের হামলা
গত ১৩ এপ্রিল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। ফিলিস্তিনের গাজায় সংঘাতের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দেখা দেয় বড় পরিসরে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার শঙ্কা। শেষ পর্যন্ত যদিও তেমন কিছু হয়নি।
সে সময় বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সম্মিলিতভাবে ইরানের চালানো সবচেয়ে বড় হামলা ছিল এটি। এমনকি রাশিয়াও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে এত সমরাস্ত্র ব্যবহার করেনি। আর ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেন ইসরায়েল লক্ষ্য করে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর এটি ছিল দেশটিতে বহিঃশত্রুর সবচেয়ে বড় হামলা।
১৩ এপ্রিল রাতে ইসরায়েলে তিন শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরান। সেগুলোর বেশির ভাগই রুখে দেওয়ার দাবি করে ইসরায়েল।
ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু
গত ১৯ মে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার ঠিক পরপরই ইসরায়েলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে। ওই হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রাইসি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আবদোল্লাহিয়ান এবং তাদের সহযাত্রীদের মৃত্যুর বিষয়টা নিশ্চিত করা হলে প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইরানের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওই দেশের নাগরিকদের কেউ কেউ। রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় কেউ কেউ ইসরায়েলকেও সন্দেহ করেন। তবে এ ঘটনায় তাদের হাত থাকার কথা অস্বীকার করে এসেছে ইসরায়েল।
পুনর্নির্বাচিত রক্তস্নাত ট্রাম্প
গত ৫ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জয়ী হয়ে ইতিহাসে নাম লেখান ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসকে ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন তিনি। ফলে তিনি হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট।
বার্তা সংস্থা এপির তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হওয়ার আগেই ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা দেশজুড়ে বিজয় উদযাপন শুরু করেন। এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তিনি একটি ‘অসাধারণ বিজয়’ পেয়েছেন। তার দ্বিতীয় শাসনামল ‘আমেরিকার স্বর্ণযুগ’ হবে দাবি করে রিপাবলিকান নেতা আরও বলেন, এটি আমেরিকার মানুষের জন্য একটি অসাধারণ বিজয়, যা আবার আমেরিকাকে মহান করতে সাহায্য করবে।
গত নির্বাচনে দোদুল্যমান রাজ্যগুলোয় বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি ট্রাম্প। ফলাফল, নির্বাচনে হার। কিন্তু এবার সেসব রাজ্যে দারুণভাবে ‘কামব্যাক’ করেছেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। জয় ছিনিয়ে এনেছেন বেশিরভাগ ব্যাটেলগ্রাউন্ডে। এবারের নির্বাচনে মূল লড়াইটা হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে। কিন্তু প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে নাস্তানাবুদ হওয়ার পর ডেমোক্র্যাট শিবিরে জোর দাবি ওঠে, ৮১ বছর বয়সী জো বাইডেনকে সরিয়ে অন্য কাউকে প্রার্থী করা হোক। তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছিলেন একের পর এক অর্থদাতা। তবুও শেষপর্যন্ত লড়াইয়ে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন বাইডেন।
কিন্তু গত ১৩ জুলাই নির্বাচনী সমাবেশে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর বদলে যায় সব হিসাব-নিকাশ। কপালজোরে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ট্রাম্প আসন্ন নির্বাচনী ভূমিধস জয় পেতে চলেছেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেন বিভিন্ন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক। শেষ পর্যন্ত অনেকটা হেসেখেলেই জয় ছিনিয়ে নেন রিপাবলিকান প্রার্থী।
থার্টি ফাস্টে আমন্ত্রিতরা পেল কনডম, থানায় অভিযোগ
কমলাপুর রেলস্টেশনের ডিসপ্লেতে হঠাৎ পর্নোগ্রাফি, ভাঙা হলো ইট ছুড়ে
ইলন মাস্কের নাম পরিবর্তন, ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম বেড়েছে ৫০০ শতাংশ