খোদাপ্রেমীদের সম্মিলন বরুণার ‘ছালানা ইজলাছ’

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:৩৩ এএম

শায়খ লুৎফুর রহমান বর্ণভি (রহ.) প্রতিষ্ঠিত এবং শায়খ খলিলুর রহমান হামিদি (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া লুৎফিয়া আনওয়ারুল উলুম হামিদনগর, যা বরুণা মাদ্রাসা নামেও প্রসিদ্ধ। মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের ছালানা ইজলাছ (বার্ষিক সভা) অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৩ জানুয়ারি শুক্রবার। ‘ছালানা ইজলাছ’ ইমান পরিশুদ্ধকরণের এক অনন্য সম্মেলন। বলা যায়, শিরিক-বিদআত মুক্ত হয়ে ইমানি নুরে উদ্ভাসিত হওয়ার নবজাগরণের এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। এখানেই রুহের খোরাক মিলে। অজানা উদ্দেশে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো প্রাণগুলোর শেষ গন্তব্য এখানেই। দিশেহারা মানুষের আশ্রয়স্থল এটাই। এখানে আশার সন্ধান আছে, হতাশা নেই। এখানে আলো আছে, আঁধার নেই। তাই তো মানুষ এখানে ছুটে আসে দূর গ্রাম-গঞ্জ, দূর শহর ও দূর দেশ থেকে। অনেক আগ থেকেই ছুটে আসেন তারা। পাগলের মতো শামিল হন ছালানা ইজলাছে। একই শামিয়ানার নিচে বৃহৎ জামাতে আদায় করেন জুমা। রাত জেগে রোনাজারি আর দোয়ায় শামিল হতে পিছপা হন না কেউ। ‘আমিন আমিন’-এর প্রকম্পিত আওয়াজে শিহরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।

এটি মহান আল্লাহ নেক বান্দাদের এক অপূর্ব সম্মিলন। আধ্যাত্মিকতার সবক নিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসা মুসল্লিদের পদভারে মুখরিত বরুণা প্রান্তর সেদিন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। মহান আল্লাহর ওলিদের নেক নসিহত আর রাব্বে কারিমের সকাশে শেষ রাতের দীর্ঘ অশ্রুমাখা মোনাজাত মহান রবের রহমতের দরিয়ায় যেন সেদিন এক মহাতরঙ্গ সৃষ্টি করে। শায়খে বর্ণভি (রহ.) ও হামিদি (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যের এ রুহানি সম্মেলন আমাদের প্রাণের স্পন্দন। আধ্যাত্মিকতার পরশ নিয়ে যুগ-যুগান্তরে জারি থাকুক এই রুহানি সম্মেলন। এবারের ছালানা ইজলাছকে রাব্বে কারিম ভরপুর কামিয়াব দান করুন, আগত সব মেহমান ও মুসল্লিদের নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে রাখুন।

সমাজকে মানবতার গুণে গুণান্বিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা এবং দ্বীনি চেতনাবোধের উন্মেষ ঘটিয়ে মানুষের মাঝে নৈতিক ও চারিত্রিক শক্তিকে জোরদার করা, সর্বোপরি মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করার মহান স্বপ্ন নিয়ে ১৯৪১ সালে দারুল উলুম দেওবন্দের অগ্রসৈনিক শায়খুল ইসলাম সাইয়িদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর সুযোগ্য শিষ্য ও খলিফা আল্লামা শায়খ লুৎফুর রহমান বর্ণভি (রহ.) জামিয়া লুৎফিয়া আনওয়ারুল উলুম হামিদনগর (বরুণা মাদ্রাসা) প্রতিষ্ঠা করেন। শায়খুল হাদিস আল্লামা শায়খ খলিলুর রহমান হামিদি (রহ.)-এর সুদীর্ঘ পাঁচ যুগের ধারাবাহিক পরিচালনায় এ প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বময় অনন্যতায় স্থান কুড়িয়েছে। ফলে পাল্টে যায় এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ। যেখানে ছিল অন্ধকার, সেখানে পড়েছে আলোর পরশ। শায়খ বদরুল আলম হামিদির দূরদর্শী নেতৃত্বে বর্তমানে ৮৭ জন সুযোগ্য শিক্ষকমণ্ডলীর সক্রিয় তত্ত্বাবধানে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞান অর্জন করছে। আলহামদুলিল্লাহ! মাদ্রাসা দিন দিন সার্বিক উন্নতির দিকে এবং অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অগ্রসর হচ্ছে। বোর্ডের পরীক্ষায় ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করছে। বিগত শিক্ষাবর্ষে বরুণা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সিলেট বিভাগে সবার শীর্ষে ফলাফল অর্জন করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হলো। এক. কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যুগোপযোগী ও উৎপাদনমুখী ইসলামি শিক্ষার ভিত্তি রচনা করা। দুই. উপমহাদেশে ইসলামি রেনেসাঁর অগ্রদূত শাহ ওয়ালি উল্লাহ (রহ.)-এর চিন্তা-চেতনায় বিশ^ বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসরণ করা। তিন. দ্বীন ইসলামের হেফাজত, তালিম ও তাবলিগের খেদমত করা। চার. রাসুল (সা.)-এর সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিনের ভাবধারা, আকিদা-বিশ্বাস ও আমল-আখলাক অনুসরণের পরিবেশ সৃষ্টি করা। পাঁচ. ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সমন্বয় সাধন করে শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। ছয়. বক্তৃতা, লিখনী ও দাওয়াতের মাধ্যমে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের কাজকে আঞ্জাম দেওয়ার সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা।

মাদ্রাসা শিক্ষার মৌলিক বিষয়াবলির ওপর কোনো প্রকার ব্যঘাত না ঘটিয়ে এটাকে অধিকতর সুষ্ঠু, সক্রিয় ও যুগের চাহিদা মেটানোর উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দরসে নেজামির পাশাপাশি দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, ভূগোল ও বিজ্ঞানবিষয়গুলোকে বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যাতে সর্বোচ্চ এক বছরে কায়দা হতে তাজবিদসহ পূর্ণ কোরআন শরিফ, মাসনুন দোয়াসমূহ, ৪০ হাদিস, অজু-গোসল ও নামাজের মাসয়ালাসমূহ আয়ত্ত করতে পারে সে জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের তাজবিদ ও তারতিলের সঙ্গে পূর্ণ কোরআন শরিফ মুখস্থ করানো হয়। পূর্ণ কোরআন শরিফ মুখস্থ করানোর জন্য মোটামুটি ৩ বছর সময় ধার্য করা হয়েছে। এ জন্য ১৫০০ ছাত্রের সার্বিক ভরণ-পোষণের দায়িত্ব মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ বহন করার ব্যবস্থা নিয়েছে। বর্তমানে আদর্শ প্রাইমারি মক্তব, হিফজ বিভাগসহ মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক স্তর হতে সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত রয়েছে। কেরাত বিভাগ, ফাতোয়া বিভাগ, আদব বিভাগ, তাফসির বিভাগসহ প্রয়োজনীয় সব বিভাগ দ্বারা সমৃদ্ধ এই মাদ্রাসা। এ ছাড়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গণশিক্ষা, ইসলামি রিসার্চ সেন্টার রয়েছে। সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থাপানয় মাদ্রাসাতুল বানাত বা নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব বিভাগে এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৫০ জন।

মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য দুটি কমিটি রয়েছে। এক. মজলিশে শুরা বা সাধারণ পরিষদ, সদস্য সংখ্যা ৩১ জন। দুই. মজলিশে আমেলা বা কার্যনির্বাহী কমিটি, সদস্য সংখ্যা ১৩ জন। শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা ৮৭ জন। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় ১১ শাওয়াল হতে। শেষ হয় ১৪ শাবান। রমজান মাসে চলে বিশেষ প্রশিক্ষণ।

মাদ্রাসার পরিচালনাধীন বহুমুখী কার্যক্রগুলো হলো এক. আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দুই. ফ্রি মেডিকেল সেন্টার। তিন. মাসিক হেফাজতে ইসলাম। চার. লুৎফিয়া এতিমখানা। পাঁচ. সমাজসেবামূলক কার্যক্রম। ছয়. আল খলিল কোরআন শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানের সদরে মুহতামিম হাফেজ মাওলানা শায়খ সাইদুর রহমান হামিদি। নায়েবে সদরে মুহতামিম মুফতি রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভি, মাওলানা সাইদুর রহমান হামিদি, মাওলানা মুহিবুর রহমান সালিক হামিদি, মাওলানা শেখ নুরে আলম হামিদি, হাফেজ মাওলানা ওলিউর রহমান বর্ণভি। প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল মাওলানা শেখ বদরুল আলম হামিদি। মুঈনে মুহতামিম মাওলানা শেখ হাদি আলম হামিদি, মাওলানা শেখ মামুন আলম হামিদি। নেগরানে আলা হাফেজ মাওলানা হামিদুর রহমান ইয়াকুত হামিদি।www. borunamadrasah.org ম হলো মাদ্রাসার ওয়েবসাইট। [email protected]  হলো মাদ্রাসার ইমেইল। মাদ্রাসার বার্ষিক ব্যয় ৫ কোটি টাকা। সম্প্রতি বেশ কিছু কাজ বাস্তবায়ন করার সিদ্ধন্ত নেওয়া হয়েছে। ভবন নির্মাণ, হাসপাতাল নির্মাণ, কৃষি উৎপাদন, মৎস্য খামার ও গবাদি খামার নির্মাণ, খাল খনন ও সংস্কার, রাস্তা নির্মাণ ও লাইটিং ব্যবস্থা, অজু-গোসলের ঘাট নির্মাণ, ১০০ জন আলেমের জন্য গৃহনির্মাণ, বিশুদ্ব পানির ব্যবস্থা ও ভুমি ক্রয় (ওলামা সিটি প্রকল্প), এতে একটি ইসলামিক কেজি স্কুল এবং একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ নির্মাণ ব্যয় এবং জায়গা খরিদ করে একটি কবরস্থান নির্মাণ। এই কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্য বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বমোট ২৫ কোটি টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত