আমেরিকান মুসলিম নারীর কীর্তিগাথা

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১০:০২ এএম

পৃথিবীতে এমন বহু মানুষ ছিলেন, যারা ভিন্ন ধর্মের হলেও পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। বিভিন্ন কীর্তির মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন মরিয়ম জামিলা। তিনি ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নারী। পূর্বে মার্গারেট মার্কস নামে পরিচিত ছিলেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন। তার জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৩ মে, নিউ ইয়র্কের একটি সচ্ছল ইহুদি পরিবারে। তার শৈশব কাটে মুক্তচিন্তার পরিবেশে। তিনি ছোটবেলায় নানা মানসিক ও শারীরিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন, যা তার আত্মিক জগৎকে প্রভাবিত করে।

মরিয়ম জামিলা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও অধ্যবসায়ী। যদিও তিনি নিউ ইয়র্কের সেরা স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করেছিলেন, কিন্তু প্রথাগত শিক্ষা তাকে আত্মতৃপ্তি দিতে পারেনি। তিনি মানসিক চাপ এবং অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন, যা তাকে জীবনের গভীর অর্থ খোঁজার দিকে ধাবিত করে।

কলেজ জীবনে তিনি ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং একটি সময়ে তিনি ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৪৮  সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার গভীর সহানুভূতি তৈরি হয়। তিনি ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষের কষ্ট দেখে ব্যথিত হন এবং পশ্চিমা মিডিয়ার পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদনে হতাশা প্রকাশ করেন। ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ তাকে প্রচণ্ড ব্যথিত করে। তিনি মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘আহমদ খলিল : একজন ফিলিস্তিনি আরব শরণার্থীর জীবনী’ শিরোনামে একটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। এই গল্পে তিনি একজন ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও তার পরিবারের জীবনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি নিজেই পেন্সিল স্কেচ ও রঙিন অঙ্কনের মাধ্যমে বইটি অলঙ্কৃত করেছিলেন।

মরিয়ম জামিলা কৈশোরে বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সত্য অনুসন্ধানের জন্য ব্যাপক গবেষণা শুরু করেন। ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। কিন্তু কেবল ইসলাম ধর্মেই শান্তি খুঁজে পান। কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ পড়েন। মুহাম্মদ আসাদের ‘দ্য রোড টু মক্কা’ পড়েও ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুপ্রাণিত হন। তিনি দেখতে পান যে, ইসলামই তার আত্মিক অশান্তি দূর করতে পারে।

১৯৬১ সালে ২৭ বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মরিয়ম জামিলা নাম গ্রহণ করেন। এর পরের বছর তিনি পাকিস্তান চলে যান এবং মুহাম্মদ ইউসুফ খান নামে একজনকে বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল শান্তিপূর্ণ এবং তারা একসঙ্গে ইসলামের সেবায় নিয়োজিত হন। তাদের সন্তানসন্ততি পাঁচজন। সবাই ইসলামি শিক্ষা ও আদর্শে বড় হন।

মরিয়ম জামিলা ছিলেন একজন গভীর চিন্তাশীল এবং সাহসী লেখক। তার ত্রিশটিরও বেশি গ্রন্থ ইসলামের মৌলিক দর্শন, পশ্চিমা সভ্যতার সমালোচনা এবং আধুনিক বিশ্বে ইসলামের প্রাসঙ্গিকতার ওপর আলোকপাত করে। তার বইগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। তার যাবতীয় রচনা, বক্তব্য, ভিডিও ক্যাসেট ও চিত্রকর্ম নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

তিনি পশ্চিমা সভ্যতার নৈতিক অবক্ষয়ের সমালোচনা করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, ইসলামি জীবনব্যবস্থা কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারে। তিনি একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইসলামের চিন্তাধারার প্রচারে নিবেদিত ছিলেন।

মরিয়ম জামিলার জীবন আমাদের শেখায় সত্যের পথে অবিচল থাকতে এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে। তিনি ২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর পাকিস্তানের লাহোরে মৃত্যুবরণ করেন। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত