নতুন খ্রিস্টীয় বছর শুরু হয়েছে। নানা প্রত্যাশা আর স্বপ্ন পূরণের আকাক্সক্ষা প্রতি নতুন বছরের আগমনে আমরা করে থাকি। এবারের নতুন বছরেও আমরা তেমনই প্রত্যাশা করছি বৈকি। নতুন বছরে আমাদের হরেক প্রত্যাশার সেরা প্রত্যাশাটি হচ্ছে দেশপ্রেম। ওটা না থাকলে সব প্রত্যাশাই অন্তঃসার হয়ে পড়ে। তবে সত্য হচ্ছে, দেশপ্রেম নিহত হয়নি; তবে বেশ আহত হয়েছে যে সেটা ঠিক। যে জন্য কাতর অবস্থায় পড়ে আছে। কাতরাবে যে এমন জোরও পাচ্ছে না, নিজের মধ্যে। সেবা-শুশ্রুষার লোক নেই। তা কার হাতে আহত হলো আমাদের ওই অতিজীবন্ত দেশপ্রেম? অতিজীবন্তই তো ছিল সে এতদিন, বিশেষ করে একাত্তরে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমরা বারবার বিদ্রোহ করেছি, ব্রিটিশ আমলে যেমন পাকিস্তান আমলেও তেমনি। বিদ্রোহ যে করেছি সেটা ওই দেশপ্রেমের কারণেই। অনেক কাল ধরেই সমষ্টিগতভাবে বাঙালি রাষ্ট্রদ্রোহী, কিন্তু কখনোই দেশদ্রোহী ছিল না। দেশ বলতে কেবল ভূমি বোঝায় না; ভূমি তো বোঝাবেই, কিন্তু দেশ ভূমির চেয়েও বড়, অনেক অনেক বড়, কেননা দেশে মানুষ আছে, মানুষ থাকে এবং সে জন্যই দেশ অমন তাৎপর্যপূর্ণ। দেশপ্রেম বলতে আসলে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসাই বোঝায়।
আমাদের এই দেশপ্রেম বারবার পরীক্ষা ও নির্যাতনের মুখে পড়েছে। একাত্তরের কথা আমরা ঘুরে ঘুরে বলি, কেননা চরম একটা পরীক্ষা তখনই হয়েছে। তার আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে, কিন্তু একাত্তরে যেমনটা হয়েছে বাঙালির জন্য দেশপ্রেমের পরীক্ষা তেমনটি আর কখনো হয়নি। হানাদাররা সব দেশপ্রেমিক মানুষকেই সেদিন প্রাণদণ্ডাদেশ দিয়েছিল, অপেক্ষাটা ছিল আদেশ কার্যকর করবার মাত্র। স্বাধীনতার পরে দক্ষিণপন্থি একটি বাংলা দৈনিক লিখেছিল কমিউনিস্টদের আণ্ডাবাচ্চা সমেত খুঁজে বের করতে হবে; একাত্তর সালে চরম দক্ষিণপন্থি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শিশু-বৃদ্ধ সব দেশপ্রেমিকেরই খোঁজ করছিল, কুকুরের মতো, গন্ধ শুঁকে শুঁকে। সন্দেহভাজন যাকেই পেয়েছে হত্যা করেছে। কিন্তু ওই চরম নির্যাতনেও দেশপ্রেম নিহত হয়নি। নিহত হবে কী, উলটো শক্তিশালী হয়েছে, অগ্নি পরীক্ষিত ইস্পাতের মতো। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও বহু মানুষ সেদিন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে সম্মত হয়নি। অমনভাবে পরীক্ষিত যে-দেশপ্রেম, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যুগের পর যুগ ধরে যে যে লড়ছিল, স্বাধীনতার পরে এখন দেখছি তার ভীষণ দুর্দশা।
স্বাধীনতার পর ক্রমাগত আঘাত পেয়েছে, পেয়ে পেয়ে এখন বেশ কাতর হয়ে পড়ে রয়েছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার, একটি লক্ষ্য ধরে এগুচ্ছিল, লক্ষ্যে পৌঁছে দেখে সে আক্রান্ত, বিপদগ্রস্ত। এর অর্থ কী? স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে তাই কি দেশপ্রেমের এই নির্বীর্য অবস্থা? মোটেই তা নয়। ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্তি তো অনেক দূরের কথা, সে তো সহজে আসে না, এসেছে বলে শোনার পরেও বোঝা যায় যে আসেনি; এমনকি স্বাধীনতাও আসেনি। এসেছিল যা তা হলো, অল্পকিছু লোকের পক্ষে স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ। তারাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখেছিল, কখনো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, কখনো-বা সরাসরি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে। এরাই ছিল বড় বড় আমলা, খুব বড় ব্যবসায়ী, কেউ সরকার-সমর্থিত ষণ্ডা, ছিনতাই করে, ধর্ষণও করে থাকে। এরা অপচয় করে, পাচার করে দেয় সম্পদ। দেশকে উৎপাদনকারী হতে দেয় না, করে রাখে ব্যবসা-নির্ভর, যাতে তাদের সুবিধা হয়; কমিশন পায়। স্বাধীনতা এদেরই। আর এই স্বাধীনতার হাতেই দেশপ্রেম আহত হয়েছে, নিহত যে হয়নি, সেটা আমাদের কপালের জোর।
এইসব বিলাসী ও উচ্ছৃঙ্খল ক্ষমতাধররা সবাই আত্মপ্রেমিক, এদের মধ্যে দেশপ্রেমের নামগন্ধ নেই। ইতিহাসের মস্ত বড় পরিহাস এটা যে, পরাধীনতার কালে আমরা দেশপ্রেমিক ছিলাম, স্বাধীনতার পর উপক্রম হলো দেশপ্রেমকে হারাবার। অনেক কাল আমরা পরাধীন ছিলাম। ব্রিটিশের দুইশ বছর, পাকিস্তানের চব্বিশ বছর; সেই দীর্ঘ সময় ধরে স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হব, আশা ছিল, ছিল ভরসা; স্বাধীনতার পর দেখা গেল মার খেয়েছে দেশপ্রেম স্বয়ং।
দেশপ্রেম এবং আত্মপ্রেম পরস্পর বিরুদ্ধ বটে। কিন্তু প্রকৃত ও আলোকিত দেশপ্রেমের সঙ্গে আত্মপ্রেমের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী নয়। কেননা ব্যক্তির মুক্তি তো আসলে সমষ্টির মুক্তির মধ্যেই নিহিত। একা কোন মানুষটা কবে স্বাধীন হয়েছে? দ্বীপে যে থাকে, অথবা বনবাসে, তার তুলনায় পরাধীন আবার কে? দেবতা ও পশুর কথা আলাদা, স্বাভাবিক মানুষ স্বাধীন হয় সমাজের ভেতরে থেকেই। এবং সমাজ যদি নষ্ট হয়, তবে ব্যক্তি কী করে স্বাধীন হবে? যে-পুকুরের পানি গেছে পচে, সেখানে কোন মাছটা নিরাপদ, শুনি? যে আত্মপ্রেমের চর্চা চলছে আজ বাংলাদেশে, তাতে ভবিষ্যতে এ দেশ মনুষ্য বসবাসের যোগ্য থাকবে এমনটা ভরসা করা সহজ নয়। সত্যি কঠিন।
পরাধীনতার যুগে আমরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছি। ব্রিটিশের রাষ্ট্র আমাদের শত্রু ছিল, পাকিস্তানি রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু ছিল, কিন্তু বাংলাদেশি রাষ্ট্র? সেও কি শত্রু? শত্রু না হোক, এ-রাষ্ট্র জনগণকে স্বাধীনতা দিচ্ছে না এটা ঠিক। এ রাষ্ট্রের কর্তারা স্বাধীনভাবে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। এই নির্মম সত্যটাকে তো সাধারণ মানুষকে দিনে দিনে ক্ষণে ক্ষণে প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। পাকিস্তান আমলে বৈরী রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল মুসলিম লীগ, বিপক্ষে আওয়ামী লীগ। জনগণের পক্ষে এখন কেউ নেই। না, নেই। জনগণের জন্য বড় কোনো রাজনৈতিক দল নেই যারা ডাক দেবে দেশপ্রেমের নামে, বলবে রাষ্ট্রের এই পুরাতন স্বভাব বলবৎ রাখবার জন্য আমরা লড়িনি; একে বদলানো চাই, বদলাতে হবে।
পাকিস্তানের পক্ষে লোকে একদিন জিন্দাবাদ দিয়েছিল, নইলে সে-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো কী করে? সেদিন বিপক্ষে ছিল কংগ্রেস, পক্ষে মুসলিম লীগ। লোকে ভাবল পাকিস্তান এলে তাদের জন্য স্বাধীনতা আসবে। পাকিস্তানের পক্ষে তাই ভোট পড়েছিল শতকরা ৯৭টি। সেই ভোট দেশপ্রেমের। কিন্তু দেখা গেল যে নতুন রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি রক্ষা করল না, স্বাধীনতা চলে গেল অল্পকিছু লোকের হাতে। সাত বছর পার হতে না হতেই, ১৯৫৪ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের মানুষ আরও বর্ধিত হারে, এবার শতকরা ৯৮ জনই ভোট দিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিদার মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে। এ ভোটও দেশপ্রেমিক ভোটই। তারপরে, বাংলাদেশে ভোট হয়েছে, কিন্তু স্রোতের মতো মানুষ যে একদিকে এগোবে সেটা ঘটেনি। কেননা কোনো দলকেই মানুষ প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক মনে করেনি, মনে করেছে তারা ক্ষমতার জন্য লড়ছে। কামড়া-কামড়িই করছে, বলতে গেলে।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুটি ঘটনা একই সঙ্গে এবং ক্রমাগত বর্ধিত মাত্রায় ঘটেছে। প্রথমটি হলো দেশপ্রেমের পতন, অপরটি বৈষম্যের বৃদ্ধি। এদের আলাদা আলাদা ব্যাপার মনে হবে; কিন্তু আসলে এরা একই বিকাশের দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। আর সেই বিকাশটা হলো পুঁজিবাদের। পুঁজিবাদ ছাড়া যে বিকল্প নেই এবং ওটিই যে সবচেয়ে ভালো আদর্শ এই বোধ ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর ছিল; পাকিস্তান-বিরোধী আন্দোলনের নায়করাও এই আদর্শেই দীক্ষিত ছিলেন। ফলে পুঁজিবাদই কায়েম হয়েছে। আর পুঁজিবাদের নিয়মই তো এটা যে, সে বৈষম্য বৃদ্ধি করবে; ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও গরিব করে ছাড়বে। সেটাই ঘটেছে; স্বাধীনতা চলে গেছে ধনীদের হাতে, গরিব হয়েছে বঞ্চিত মানুষ। আর ধনী যারা তারা তো আসলে দেশপ্রেমিক নয়, তারা অত্যন্ত স্থূল ও কদর্যরূপে আত্মপ্রেমিক বটে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
