হেনস্তা-নির্যাতনে স্বেচ্ছায় অবসর, ফের ক্লাসে ফিরতে চান ঢাবি শিক্ষক  

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:০১ পিএম

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক মানসিক নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হন ড. আবু মূসা আরিফ বিল্লাহ। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্বেও বছরের পর বছর পদোন্নতির ফাইল আটকে রেখে তাকে একাডেমিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় বলে অভিযোগ। এ ছাড়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির প্রতিবাদ করে উল্টো শিকার হতে হয় ষড়যন্ত্রমূলক হয়রানির। পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনযাপন হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

অবিচার, অপরিসীম মানসিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু মূসা আরিফ বিল্লাহ। সর্বশেষ তিনি জচ্ছু নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়, চীনে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে শিক্ষকতা করেন। তবে স্বৈরাচার সরকার পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়ায় ফের তিনি আবারও ক্লাস রুমে ফিরতে চান। তিনি পড়াতে চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

আজ সোমবার তিনি চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে বিবেচনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের নিকট আবেদনও করেছেন।

ড. আবু মূসা আরিফ বিল্লাহ স্বাভাবিক জীবনযাপন হুমকির সম্মুখীন হওয়ার প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণে বাধ্য হন উল্লেখ করে আবেদনে বলেন, গত পনের বছর পতিত স্বৈরাচারের আমলে দেশ এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল। যেখানে আইনের শাসন ও ন্যায় নীতির কোনও বালাই ছিল না। আমাদের প্রাণপ্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর ব্যতিক্রম ছিল না। মেধা ও যোগ্যতার বিচার বিবেচনা না করে দলীয় আনুগত্য ও স্বার্থই মুখ্য বিষয় হয়ে পড়েছিল। এখানে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন না করে এর ব্যতিক্রম দুষ্টের পালন ও শিষ্টের দমন প্রচলিত হয়েছিল। আর এই চরম সংকটকালে আমার একাডেমিক জীবন ধ্বংসের লক্ষ্যে লক্ষ্যে বহুমুখী ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, আমার কর্মস্থল ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে বেশ কিছু অনিয়ম বিশেষত গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি বিষয়ে আমি প্রতিবাদ করি এবং বিভাগে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র শিক্ষকদের দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবে জুনিয়র শিক্ষকগণ অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। অনেক সুস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকার পড়েও তারা যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারেননি। আমি বাধ্য হয়ে তৎকালীন উপাচার্য অফিসে পর পর বেশ কয়েকটি আবেদন করি। যেগুলো এখনও উপাচার্য অফিসে নথিবদ আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অদ্যাবধি কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ তো দূরের কথা শুধুমাত্র দলীয় ও রাজনৈতিক কারণে আমলেই নেওয়া হয়নি। বিপরীতে আমার ওপর নেমে এসেছিল একের পর এক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রমূলক হয়রানি।

২৭ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়েও অধ্যাপক হতে পারিনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বছরের পর বছর আমার আবেক্ষাধীন, কনফার্মেশন ও পদোন্নতির ফাইল কখনও চেয়ারম্যান অফিসে, কখনও রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে এবং কখনও উপাচার্য দপ্তরে ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত আটকে রেখে আমার প্রতি মানসিক নির্যাতন করা হয় এবং আমাকে একাডেমিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। বিভাগে একে একে ৬ জন শিক্ষক অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। মাত্র ৮/১০ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে এবং চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের কেউ কেউ অধ্যাপক হয়েছে। আর আমার কেবল একটিমাত্র ফাইল ৬ বছর আটকে রাখা হয়েছে। ফলে আমি দীর্ঘ ২৭ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়েও অধ্যাপক হতে পারিনি। এসব যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির শিকার হয়ে এক সময় আমি হাঁপিয়ে উঠি। মানসিকভাবে বিপর্যন্ত হয়ে পড়ি। এমনকি আমি আমার জীবন নিয়েও শঙ্কিত হয়ে পড়ি। তখন আমি ব্যক্তিগত ও পরিবারের কথা চিন্তা করে আকস্মিকভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় অরসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

আরিফ বিল্লাহ বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারসিজ বৃত্তি নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। এ সময়ে আমি সোয়াসে এবং কিংস কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বেশ কয়েক বছর বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলাম। আমি একজন দক্ষ ভাষা শিক্ষাবিদ হিসেবে সুনাম অর্জন করি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে আমাকে বার বার বলা সত্যেও প্রথম বর্ষের ছাত্র ছাত্রীদের ভাষা শিক্ষার কোর্স পড়াতে দেওয়া হয়নি। ছাত্র ছাত্রীদের ফার্সি ভাষায় চরম দুর্বলতা লক্ষ্য করে আমি বাধ্য হয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরূপ সপ্তাহে দুটি লাঞ্চটাইম ইনটেনসিভ স্পোকেন পার্সিয়ান" ক্লাস চালু করি। এতে ৭০/৮০ জন ছাত্র ছাত্রী অংশ নিয়ে ফার্সি ভাষায় কিছুটা দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হন।

তিনি আরও বলেন, আমার পিএইচ ডি ডিগ্রি শেষ হওয়ার পর আমি সোয়াসে পোস্ট ডক্টরাল করার অফার পাই। আমি এক বছরের জন্য ছুটি বৃদ্ধির আবেদন করি। এ ছাড়া আমার ভিসা শেষ হয়ে যাওয়ায় ভিসা বৃদ্ধির আবেদন করি। কিন্তু বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হলেও আমার পাসপোর্ট ফিরে পাচ্ছিলাম না। এ সময় ইস্ট লন্ডনে আয়োজিত ৭২ এর সংবিধান সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করি। পরে জেনেছিলাম যে আমার এই বক্তব্যের একটি ভিডিও ফুটেজ লন্ডনে বাংলাদেশ সেসময় দূতাবাসের আধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দপ্তরে প্রেরিত হয়। সে সময় থেকেই আমার বিরুদ্ধে নিষ্পেষণ শুরু হয়।

'আমি ঢাকায় আমার এক সহকর্মীকে ফোন করি। এ সময় জনতে পারি তিন দিনের মধ্যে দেশে ফিরে কাজে যোগদান না করলে আমার চাকরি থাকবে না মর্মে একদিন আগে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমি বললাম আমি তো কোনও নোটিশ পাইনি। কোনও ইমেইলও পাঠানো হয়নি। যাহোক আমি জ্বরে জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম। বাসায় বসে বসেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিসা সংক্রান্ত অফিসারদের কয়েকজনকে ফোনে আমার সমস্যার বিষয়ে জানালাম। উনারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। দেশে এসে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগে বিভাগে যোগদান করে এ যাত্রায় চাকরি রক্ষা করলাম বটে, কিন্তু আমার ওপর ষড়যন্ত্রের শ্যেন দৃষ্টি অব্যাহত থাকে।'

আবেদনের বিষয়ে সহযোগী অধ্যাপক আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি উপাচার্যকে আবেদন দিয়েছি। আমার ওপর করা নির্যাতনের কথাগুলো বলেছি। তিনি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। আশাকরি আমি আবারও ক্লাসে ফিরতে পারব। শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য আমি মুখিয়ে আছি।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আবেদনটি পেয়েছি। যারা নির্যাতন-অবিচারের শিকার হয়েছে তাদের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এরজন্য আমরা একটা কমিটি করে দিয়েছি। আশাকরি দ্রুত একটা সমাধান হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত