চলতি শিক্ষাবর্ষে সব শিক্ষার্থী কবে নাগাদ সব পাঠ্যবই পাবে, তা বলতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন খোদ শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
বিগত সময়ে মার্চের আগে পুরোপুরি বই দেওয়া হয়নি জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা (বই ছাপা) কার্যক্রম শুরু করেছি দেরিতে। আমাদের বই পরিমার্জন করতে হয়েছে। বইয়ের সিলেবাস, কারিকুলাম নতুন করে করতে হয়েছে। বইয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বিদেশে কোনো বই ছাপানো হচ্ছে না। দেশের সক্ষমতা কত, সেটা এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে। এতে করে তো দেরি হবেই।’ তিনি বলেন, ‘এ বছরই বোঝা গেল সবগুলো গোডাউন যেখানে আর্ট পেপারগুলো জমার ছিল, সেগুলো সব উদ্ধার করার পরও দেশের ভেতর আপাতত কিছু ঘাটতি আছে। (আর্ট পেপার নিয়ে) বিদেশ থেকে জাহাজ রওনা হয়ে গেছে।’
কবে নাগাদ সব শিক্ষার্থী বই পাবে জানতে চাইলে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘কবে নাগাদ সবাই সব বই পাবে, এটা আমি বলতে পারব না।’
এর আগে বই বিতরণ অনুষ্ঠানে বই ছাপার কাজে বিলম্বের কিছু কারণ ব্যাখ্যা করেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘এ বইগুলো ছাপা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মতো অবস্থা হয়েছে। এখানে প্রথমত হলো, বিদেশে বই ছাপানো হবে না। অনিবার্য কারণে শিক্ষাক্রমও পরিবর্তন করা হয়েছে, এতে বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে। যে সময় থেকে এই কাজ শুরু করা হয়েছে, তখন সময়ও খুব কম ছিল। তার মধ্যে আবার অনেক বই পরিমার্জন করতে হয়েছে; যাতে দলীয় রাজনীতি নিরপেক্ষভাবে যেন বইয়ে থাকে... সেগুলো শুদ্ধ করা হয়েছে। তারপর আবার উন্নতমানের ছাপা, উন্নতমানের কাগজ, উন্নতমানের মলাটের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এনসিটিবিতে যারা এত দিন ধরে কাজ করেছেন, তাদের অনেককে অনিবার্য কারণে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে আগে অভিজ্ঞতা ছিল, এমন মানুষকেই বসানো হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের কীভাবে বোঝাপড়া করতে হয়, এটি তাদের অভিজ্ঞতায় নেই।’
বিনামূল্যে বছরের শুরুতে বই দেওয়া দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে তাদের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবেই প্রচার করত। বিগত ১৫ বছর, বছরের প্রথম দিন অনেক টাকা ব্যয় করে সরকার বই উৎসব করত। করোনাকাল ছাড়া ২০১০ সাল থেকে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় উৎসব করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে বই তুলে দেওয়ার বিষয়টি অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়।
তবে এ বছর সরকার খরচ বাঁচাতে বছরের প্রথম দিন বই উৎসব বাতিল করে। এ ছাড়া গত বছরের শেষ সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পাঠ্যবইয়ে কিছু পরিবর্তনের কারণে এবার নতুন বছরের প্রথম দিন বই পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এনসিটিবি সূত্রমতে, নতুন শিক্ষাবর্ষে চার কোটির মতো শিক্ষার্থীর জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৪০ কোটির বেশি বই ছাপানো হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৪ লাখের মতো। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানোর জন্য ছাড়পত্র হয়েছে এখন পর্যন্ত প্রায় চার কোটি বইয়ের; আর মাধ্যমিকে (মাদ্রাসার ইবতেদায়িসহ) বইয়ের সংখ্যা ৩১ কোটি ৯৬ লাখের মতো। এর মধ্যে ছাড়পত্র হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখের মতো। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক বই এখনো উপজেলায় পাঠানো যায়নি।
প্রতিবছর জুন-জুলাই মাস থেকে নতুন বই ছাপানোর কাজ শুরু করা হয়। চলতি বছর আওয়ামী লীগ সরকার সে অনুযায়ী কাজ শুরু করে। তবে বিপত্তি ঘটে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর। এনসিটিবিতে বড় ধরনের রদবদল ঘটে। চেয়ারম্যানসহ একাধিক সদস্য পদত্যাগ করেন। অন্তর্বর্তী সরকার সেখানে নতুনদের পদায়ন করে। এরই মধ্যে নতুন কারিকুলাম বাতিলের দাবি ওঠে। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের গল্প ও গ্রাফিতি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়। সেসব গল্প রচনা ও পরিমার্জন করার জন্য নতুন করে কাজ করতে হয়। এ কারণে অতিরিক্ত সময় লাগে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকাশনী সংস্থাগুলোর কাগজ না পাওয়া এবং ব্যাংকঋণ পেতে বিলম্ব হওয়ার বিষয়টি। বই না পাওয়ায় পড়াশোনায়ও ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের। অভিভাবকদেরও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
