প্রায় ৪০০ কোটি টাকা রাজস্বের আশায় ক্ষমতাচ্যুত সরকারের এমপিদের গাড়ি নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে কাস্টমস। এসব গাড়ি নিলামের পরিবর্তে যদি সরকারের সব পাওনা পরিশোধ করে ডেলিভারি নিয়ে যায় তাহলে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব পাবে সরকার। এর আগে এমপি সুবিধায় আসা গাড়িগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে জানতে চেয়ে গত ২১ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল চট্টগ্রাম কাস্টমস। চিঠির জবাবে এগুলো আমদানিকারককে সব ফি পরিশোধ করে নেওয়ার জন্য চিঠি দিতে বলা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এমপি কোটায় আনা গাড়ির আমদানিকারকদের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র ও উপকমিশনার সাইদুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আমদানিকারকদের চিঠি দিয়েছি। চিঠি পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের সরকারের নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধ করে নিয়ে যেতে হবে। এই সময়ের মধ্যে যদি কেউ গাড়ি ডেলিভারি না নেন তাহলে নিলাম প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব মুহম্মদ রইস উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে রেয়াতি সুবিধায় এমপি কোটায় আনা গাড়ির শুল্কায়ন ও ছাড়করণ প্রসঙ্গে বলা হয়, আমদানিকৃত গাড়িগুলো জাতীয় সংসদের সদস্যপদ সংক্রান্ত কার্যাবলি সম্পাদনের স্বার্থে সংসদ সদস্যদের প্রয়োজন অনুসারের শুল্কমুক্ত সুবিধায় ছাড়যোগ্য। কিন্তু বর্তমানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ায় আমদানিকারক সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ না থাকায় গাড়িগুলোর বর্ণিত উদ্দেশ্য, শুল্কায়নের প্রাসঙ্গিকতা নেই মর্মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মনে করে। তাই গাড়িগুলো খালাসের ক্ষেত্রে আমদানিকারক স্বেচ্ছায় আবেদন করলে সেই আবেদনের ভিত্তিতে রেয়াতি সুবিধা ছাড়া স্বাভাবিক শুল্ক কর আদায় সাপেক্ষে খালাস প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
আমদানিকারক নিলে কাস্টমসের রাজস্ব বাড়বে কীভাবে? এ প্রশ্নের জবাবে একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকায় কেনা ল্যান্ড ক্রুজার, রেঞ্জ রোভার, টয়োটা জিপ, টয়োটা এলসি স্টেশন, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউর মতো বিলাসবহুল প্রতিটি গাড়ির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। কিন্তু রেয়াতি সুবিধার কারণে এমপি কোটায় আনা এই গাড়িগুলো ক্রয়মূল্যেই ডেলিভারির সুবিধা পেতেন সংসদ সদস্যরা। এখন রেয়াতি সুবিধা ছাড়া বর্তমান স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ডেলিভারি নিলে প্রতিটি গাড়িতে গড়ে সাড়ে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত শুল্ক পাবে কাস্টমস। এতে ৪২টি গাড়িতে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা রাজস্ব পাবে সরকার। কিন্তু এসব গাড়ি যদি নিলামে বিক্রি হয় সেক্ষেত্রে চার কোটির বেশি মূল্য ওঠার সম্ভাবনা কম। আর এই টাকায়ও কেউ কিনবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। এ বিষয়ে কাস্টমসের নিলামের বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানিকারক যদি গাড়িগুলো পর্যাপ্ত শুল্ক দিয়ে ডেলিভারি নেন তাহলে সরকারের বেশি রাজস্ব আহরণ হবে। নিলামে এত দাম পাওয়া যাবে না। তবে যেই সুবিধায় এগুলো আনা হয়েছিল তারা তো এখন আর এমপি নেই। তারা কীভাবে এসব গাড়ি নেবেন?
তবে এমপি কোটায় আনা এসব গাড়ির সর্বশেষ ভবিষ্যৎ নিলাম বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, এমপি সুবিধায় আনা এসব গাড়ি শুল্ক দিয়ে ডেলিভারি নিতে গেলে প্রতিটির দাম পড়বে প্রায় আট থেকে ১০ কোটি টাকা। এত টাকা দিয়ে কেউ এগুলো ডেলিভারি নিতে আসবেন না। তাই এগুলো হয়তো পরে নিলামেই যাবে। তিনি আরও বলেন, এসব দামি গাড়িগুলো নিলাম প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই রেয়াত কমিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারের কোনো সংস্থাকে দেওয়া যায় কি না তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে অন্ততপক্ষে গাড়িগুলো ব্যবহারের মধ্যে থাকবে এবং নষ্ট হবে না।
কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, সরকারের এমপি কোটার সুবিধা নিয়ে ৫০ জন এমপি শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অনুমতি পান। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, ব্যারিস্টার সুমন, নায়ক ফেরদৌসহ আট জন গাড়ি খালাস করে নিয়ে যান। ৫ আগস্টের পর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আসা ২৪টি গাড়ি ইতিমধ্যে নিলামের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে কাস্টমসের কাছে ডকুমেন্ট পাঠানো হয়েছে। সাধারণত বন্দরে আসার ৩০ দিনের মধ্যে কেউ ডেলিভারি না নিলে এগুলো নিলামের জন্য কাস্টমসকে চিঠি পাঠিয়ে থাকে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত অক্টোবর পর্যন্ত এমন ২৪টি গাড়ির তালিকা কাস্টমসকে দেওয়া হয়েছে বন্দরের পক্ষ থেকে। বাকি ১৮টি গাড়িও ইতিমধ্যে পৌঁছানোর কথা। সে হিসাবে এমপি কোটায় ৪২টি গাড়ি থাকার কথা।
জানা যায়, পিরোজপুর-২ এর সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, ময়মনসিংহ-৭ এর এবিএম আনিসুজ্জামান, বগুড়া-৫ এর মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-২ আসনের এমপি জিন্নাত আরা হেনরি, সুনামগঞ্জ-১ এর রণজিত চন্দ্র সরকার, নেত্রকোনা-৪ এর এমপি সাজ্জাদুল হাসান, গাইবান্ধা-২ এর শাহ সারোয়ার কবির, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ এর এস এ কে একরামুজ্জামান, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড-)-এর এমপি এস এম আল মামুন, খুলনা-৩ এর এস এম কামাল হোসাইন, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী)-এর মুজিবুর রহমান, নওগাঁ-৩ এর সুরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, সংরক্ষিত নারী আসন-১৩ এর এমপি অভিনেত্রী তারানা হালিম, ঝিনাইদহ-২ এর নাসের শাহরিয়ার জাহেদী, জামালপুর-৫ এর আবুল কালাম আজাদ, সুনামগঞ্জ-৪ এর মুহাম্মদ সিদ্দিক, চট্টগ্রাম-১৫ এর আবদুল মোতালেব, সংরক্ষিত নারী আসন-১৪ এর শাম্মী আহমেদ, ময়মনসিংহ-১১ এর আবদুল ওয়াহেদ, সংরক্ষিত নারী আসন ১২-এর রুনা রেজা, যশোর-২ এর তৌহিদুজ্জামান, টাঙ্গাইল-৮ আসনের অনুপম শাহজাহান জয়, নীলফামারী-৩ এর সাদ্দাম হোসাইন পাভেল ও সংরক্ষিত নারী আসন-৩৫ ফরিদা ইয়াসমিনের গাড়ি বন্দরের কার শেডে রয়েছে।
নিলাম জটিলতার কারণে বন্দরের শেডে পড়ে থেকে শতাধিক গাড়ি নষ্ট হচ্ছে। কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিলাম করা হলেও মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় বিলম্বিত হয়।
