বিদ্যুতের ক্ষতি কমাতে গ্রাহকদের ঘরে প্রিপেইড মিটারের দাওয়াই কাজে আসছে না। এই মিটার নিয়ে গ্রাহকদের বিস্তর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। গ্রাহক সুবিধার কথা বলে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করলেও সরকারি এই প্রকল্প এখন অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। উল্টো গ্রাহক হয়রানি বেড়েছে কয়েকগুণ। যখন-তখন মিটার লক হয়ে যাওয়া, ভুতুড়ে বিল, জরুরি ব্যালান্স বিড়ম্বনা, অতিরিক্ত চার্জ কাটা, রিচার্জ সমস্যা, ব্যাটারি সিন্ডিকেটে পড়ে গ্রাহকদের নাভিশ্বাস তৈরিসহ নানা কারণে এই মিটার চট্টগ্রামের প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে।
প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে গ্রাহকরা। রিচার্জ করতে ডিজিট চাপতে গিয়ে ভুল হচ্ছে। আর তিনবার ভুল হলেই মিটার লক হয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে সার্ভার জটিলতার কারণেও মিটারে রিচার্জ করা যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। গ্রাহক ভোগান্তির বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল একাধিকবার কল করা হলেও মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি পিডিবি চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলীয় জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবীর মজুমদার। তবে সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা আকবর হোসেন প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকের হয়রানির কথা কিছুটা স্বীকার করেন। পিডিবির এই কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিলে ১১ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৮টি প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা ছাবের আহমদ জানান, গত বছরের ৮ মে তার বাসায় পোস্টপেইড মিটার সরিয়ে প্রিপেইড মিটার (০১০১১২১৭২৫৭৮) লাগায় পিডিবি। তখন পোস্টপেইড মিটারে ব্যবহৃত ইউনিট ছিল ২১৯৩৩। কিন্তু ১৪ জুন তাকে দেওয়া মে মাসের বিদ্যুৎ বিলে ব্যবহৃত ইউনিট দেখানো হয় ২৩১৭০। সে হিসেবে ছাবের আহমদকে বাড়তি ১২৪৩ ইউনিটের ভুতুড়ে বিল দেয় হাটহাজারীর বিদ্যুৎ বিভাগ। পরে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গেলে ওই ভুতুড়ে বিল সমন্বয় করে দেওয়া হবে বলে ছাবেরকে জানান সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু গেল ছয় মাসেও সেই ভুতুড়ে বিল সমন্বয় না করে উল্টো বকেয়া দেখিয়ে ছাবের আহমদের ঘরের প্রিপেইড মিটার গত সপ্তাহে ‘লক’ করে দেয় পিডিবি কর্তৃপক্ষ। তিন দিন ভোগার পর বিদ্যুৎ বিভাগে গেলে সংশ্লিষ্টরা ভুল স্বীকার করে ছাবেরের প্রিপেইড মিটার ‘আনলক’ করে দেন।
চট্টগ্রাম নগরের হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা আফসানা রহমান পোস্টপেইডের চেয়ে প্রিপেইড মিটারে তার দ্বিগুণ বিল আসছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘মাসে ৭০০ টাকার কার্ড ভরি, কিন্তু মাস যায় না। মিটার লক হয়ে যায়। আগে ৪৫০-৫০০ টাকায় মাস চলে যেত। এখন কার্ড ভরলেই ১৩০ টাকা কেটে রাখা হয়।’ একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, নতুন প্রিপেইড মিটার বসাতে গ্রাহকদের বাধ্য করা হচ্ছে। কাগজের বিলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিল পরিশোধ করতে হয় প্রিপেইড মিটারে। অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হচ্ছে। রিচার্জ করার পরই দ্রুত টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আরেক ভোগান্তি ‘জরুরি ব্যালান্স’। জরুরি ব্যালান্স নিলে পরিশোধ করতে হয় অতিরিক্ত চার্জ। রিচার্জে পোহাতে হয় নানা ঝামেলা। সব জায়গায় রিচার্জ কার্ড পাওয়া যায় না। ভুলে মিটার ‘লক’ হয়ে গেলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়। মিটার আনলক করতে দিনের পর দিন ধরনা দিতে হয় বিদ্যুৎ অফিসে।
নগরের অক্সিজেন এলাকার গ্রাহক আবদুল আলী জানান, গেল অক্টোবর মাসে তার প্রিপেইড মিটারে খরচ আসে ৭৫০ টাকা। তার দাবি, একই রকম বিদ্যুৎ খরচ করে নভেম্বরে তার বিল ১ হাজার ৩০০ টাকা আর ডিসেম্বর মাসে খরচ দিতে হয়েছে ১ হাজার ৯০০ টাকা। এ ছাড়া তার প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের সময় আগের ব্যালান্স যোগ হচ্ছে না। নির্দেশনা অনুযায়ী, বিতরণ পর্যায়ে গ্রাহককে ডিমান্ড চার্জ, মোট বিলের ৫ শতাংশ বিলম্ব মাশুল (বিলম্বে বিল পরিশোধ) এবং ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) অনুমোদন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর কোনো ধরনের চার্জ বা অর্থ আরোপ করার ক্ষমতা নেই বিতরণ কোম্পানির। অথচ দেশের ছয় বিতরণ কোম্পানি এমন সব খাতে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে, যাতে বিইআরসির অনুমোদন নেই।
বিল ছাড়াও ভোগান্তির আরেক নাম রিচার্জ। রিচার্জ করতে মিটারে প্রবেশ করাতে হয় ২০ ডিজিট (সংখ্যা)। ডিজিট প্রবেশ করাতে গিয়ে অনেকেই ভুল করে বসেন। কয়েকবার ভুল হলে লক হয়ে যাচ্ছে মিটার। এরপর অনেক সময় ধরে বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহককে। মিটার আনলক করতে গিয়ে পিডিবির কিছু কর্মচারীকে টাকা দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ গ্রাহকদের। চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকার কৃষ্ণ রায় নামে পোস্টপেইড গ্রাহকের অভিযোগ, গেল বছরের নভেম্বর মাসের বিলে বিদ্যুতের ব্যবহার দেখানো হয় (মিটার রিডিং) ৩২৮৩৪। তার হাতে বিল আসার পর (৭ ডিসেম্বর) মিটারে রিডিং দেখা যায় ৩১৬৯৫ ইউনিট। একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, প্রিপেইড বিলে ‘বিবিধ’ নামে একটি শ্রেণিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করছে পিডিবি। এ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। বাড়তি চার্জে প্রিপেইড মিটারে আগ্রহ কমছে বলে অভিমত অনেকের।
