পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে পরশ্রীকাতর বলে। পরশ্রীকাতরতা একটি অসুখ। এতে ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে হিংসা, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব, কলহ ও বিবাদ বৃদ্ধি পায়। শান্তি ও স্বস্তির জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। আজকের বাংলাদেশের চিত্র বলে দেয় মানুষের প্রতি সব মানুষের ভালোবাসা, কর্তব্যবোধ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা কমছে। খুব আশঙ্কাজনক হারেই কমছে। কিন্তু কেন কমছে? আমাদের আশপাশে সুবেশি মানুষগুলো, যাদের আমরা বন্ধু ভাবি, তাদের মধ্যেই রয়েছে বহু পরশ্রীকাতর মানুষ! আপনি ভালো আছেন, এটাও তাদের ঠিক ভালো লাগে না। বাংলা একাডেমির অভিধানে পরশ্রীকাতর শব্দটির অর্থ দেওয়া আছে এভাবে অপরের উন্নতি বা সৌভাগ্য দেখে কাতর বা ঈর্ষান্বিত হয় এমন। শব্দটির বিশেষণ পরশ্রীকাতরতা।
অন্যদিকে পরনিন্দা ঘৃণ্যতর কাজ। এটা নেকি ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মুমিনরা! তোমরা বহু ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গুনাহ। গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পেছনে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা একে ঘৃণা করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা হুজুরাত ১২)
পরনিন্দা হচ্ছে কারও ব্যাপারে অপছন্দনীয় বিষয় অন্যের কাছে বলা। হোক সেটা শারীরিক, পার্থিব অথবা ধর্মীয়। আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.) বলেন, ‘আমি পরনিন্দা করলে প্রথমে আমার বাবা-মায়ের করতাম। কেননা তারা আমার নেকি পাওয়ার বেশি হকদার।’ আমর ইবনে আস (রা.) একবার একটি মৃত খচ্চরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এটা দেখে সাহাবিদের বলেন, ‘পরনিন্দা করা অপেক্ষা এ খচ্চরের গোশত পেট ভরে খাওয়া ভালো।’
সেই আদিকাল থেকেই পরশ্রীকাতরতা ও পরনিন্দা নিরাময় অযোগ্য এক ব্যাধি। বর্তমানে ফেসবুক ইনস্টাগ্রামসহ যাবতীয় সোশ্যাল মিডিয়া এ ব্যাধিকে আরও উসকে দিচ্ছে। কেউ মন্দ থাকলে অন্যরা যতটা ব্যথিত হন, ভালো থাকলে তার চেয়ে বেশি ব্যথিত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের নিচে বাজারি শুভেচ্ছা ও শুভকামনা দেখে তাই খুশিতে বিগলিত হওয়ার কিছু নেই। এগুলো আজকাল মানসিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে নিজেকে জানুন। কারণ আমরা বোধহয় নিজেকেই সবচেয়ে কম জানি। অথচ খুব সহজেই অন্যের সম্বন্ধে মতামত জাহির করি। আমাদের নিজেদের আচরণ কেমন, আমাদের ব্যক্তিত্বের মাঝে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা আছে কি না, এ বিষয়ে সচেতনতাবোধ খুব কম মানুষের মাঝে আছে। ডিপ্রেশন, সন্দেহ প্রবণতা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা, অলসতা, অনিদ্রাজনিত সমস্যা, নানা ধরনের উদ্বেগ ও আতঙ্ক ইত্যাদি ধরনের সমস্যায় কমবেশি আমরা সবাই ভোগী। আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে মানসিকভাবে দোলাচলে ভোগী তখন এমন আচরণ বেশি করি। অন্যদিকে প্রিয়জনের অকাল মৃত্যু, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসাত্মক হামলা, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া বা প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটলে এমনটি হয়। তখন মানসিক ক্ষত সামাল দেওয়ার ক্ষমতা প্রতিটি মানুষের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ে। ঈর্ষা, বিদ্বেষ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ও কর্র্তৃত্বস্পৃহা যেখানে, আত্মকলহের উদ্ভব সেখানে। যত অন্যায় অযৌক্তিক বা নিন্দনীয়ই হোক না কেন, আমি আমার স্বার্থ ও জেদ বজায় রাখবই। আর যত ন্যায়সংগত ও যুক্তিযুক্তই হোক না কেন, অন্যের কিছুমাত্র প্রয়োজনের দিকে ফিরে তাকাা না, এমন স্বার্থান্ধতা ও একগুঁয়েমির ফলেই আত্মকলহ এবং সেটার পরিণামস্বরূপ ধ্বংস উপস্থিত হয়। বেশিরভাগ মানুষই কমবেশি পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত। এ থেকে বের হওয়ার সহজ পথ নেই। শুধু নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারলেই পরশ্রীকাতর হওয়া থেকে দূরে থাকা যায়।
মায়া, সহমর্মিতা ও সমবেদনা কমছে কেন? এর উত্তর খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এর প্রধান একটি কারণ হচ্ছে পরশ্রীকাতরতা। সে ভালো কাজ করছে, ওই ছেলেটা উন্নতি করছে, সে ভালো রেজাল্ট করেছে ইত্যাদিতে আর আমরা আনন্দ পাই না। মনে হয় কেন পাশের বাড়ির লোকটি নতুন ফ্ল্যাট কিনল, কীভাবে কিনল? নিশ্চয়ই কোনো কিন্তু আছে। ইশ! অমুকের ছেলেটা নামি স্কুলে চান্স পেল! এ বয়সেই কীভাবে এত দ্রুত সফল হলো, অমুকের স্বামী তাকে এত দামি উপহার দেয় কেন? এ লোকটা এত খ্যাতি অর্জন করছে! নাহ, নিশ্চয়ই এখানে ভেজাল আছে। আমি তো এটা পারিনি, সে কেন পারবে? আমাকেও সব পেতে হবে। আমার নেই কেন? এ ধরনের চিন্তাধারার মাঝেই রয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরশ্রীকাতরতা।
অন্যের কিছু দেখে মনঃকষ্টে ভোগা এবং ঈর্ষান্বিত হওয়া যখন থেকে আমরা বন্ধ করতে পারব তখন থেকেই অনেক বেশি সুন্দর ও স্বাভাবিক থাকতে পারব। পরশ্রীকাতরতা শুধু অতৃপ্তি ও অপূর্ণতা বাড়ায়, জীবনকে সুখী করতে পারে না। পরশ্রীকাতরতা এড়িয়ে চলুন। অন্যকে হিংসা করলে আপনি সুখী হতে পারবেন না। সবচেয়ে বড় কথা, অন্যকে হিংসা করলে আপনি নিজেকে নীচু ভাবা শুরু করবেন। অন্যের সাফল্যকে হিংসা করলে নিজেকেই ছোট করা হয়। সবসময় মনকে প্রফুল্ল রাখুন। যেকোনো পরিস্থিতিতে দেখবেন সব বিপদ কেটে যাবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরনিন্দা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
