সাহাবায়ে কেরামের নবীপ্রেম

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:১৭ এএম

ইমানের মূল হলো নবীপ্রেম। যে যতবেশি নবীপ্রেমে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছে, সে ততবেশি আল্লাহকে পেয়েছে। সাহাবিদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সব সাহাবির মনেই নবীজির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা ছিল। ছিল নবীজিকে দেখার ব্যাকুলতা। তাফসিরে মাজহারিতে মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রবিয়া বিন কাব আসলামি (রা.)-কে একদিন রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে রবিয়া! তোমার কোনো ইচ্ছে থাকলে আমাকে বলো। আমি দোয়া করব। তুমি যা চাইবে তাই পাবে।’ রবিয়া বলল, ‘ওগো নবী আমার! আমি আপনার পাগল। আপনাকে একমুহূর্ত না দেখে থাকতে পারি না। আপনি দোয়া করেন আমি যেন জান্নাতেও আপনার কদমে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারি।’ নবীজি বললেন, ‘হে রবিয়া ভেবে বলো এটাই কি তোমার চাওয়া?’ রবিয়া বলল, ‘জি হুজুর! এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো চাওয়া হতে পারে না।’ নবীজি মুচকি হেসে বললেন, ‘তাহলে বেশি বেশি সেজদা করো যেন তোমার জন্য আমি সুপারিশ করতে পারি।’ (তাফসিরে মাজহারি ৩/১৬৬)

প্রখ্যাত তাবেয়ি মাসরুক (রহ.) বলেন, ‘একদিন সাহাবিরা রাসুল (সা.)-কে বললেন, ওগো আল্লাহর রাসুল! দুনিয়াতে যখন খুশি আপনাকে দেখে প্রাণ জুড়াতে পারি। কিন্তু আখিরাতে কি আপনাকে দেখতে পারব? কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, সাহাবিরা বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আখিরাতে ইচ্ছে হলেই আপনাকে দেখতে পারব না, এ কথা ভাবতেই কষ্টে হৃদয় ভেঙে চৌচির হয়ে যায়।’ সাহাবিদের এমন আবেগঘন দৃশ্যের প্রেক্ষাপটে সুরা নিসার ৬৯ নম্বর আয়াত নাজিল করে আল্লাহ জানিয়ে দেন, ‘দুনিয়ার মতো আখিরাতেও নবীজির গোলামির পূর্ণ সুযোগ থাকবে।’ (মুসান্নিফ ইবনে আবি শায়বা)

নবুওয়াতি নুর পেতে হলে নবী (সা.)-কে ভালোবাসতে হয়। রাসুল (সা.) একাধিক হাদিসে ঘোষণা করেছেন, ‘কেউ যদি তার জীবন, সম্পদ, স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মায়ের চেয়ে আমাকে বেশি ভালো না বাসে, তাহলে সে ব্যক্তি ইমানদার হতে পারবে না।’ এক বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) ওমর (রা.)-কে বললেন, ‘হে ওমর! তুমি কি আমাকে তোমার জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসো?’ জবাবে ওমর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার সম্পদ, সন্তান, বাবা-মা সবার চেয়ে আপনাকে বেশি ভালোবাসি। তবে আমার জীবনের চেয়ে বেশি এখনো আপনাকে ভালোবাসতে পারেনি।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাহলে মুমিন হতে তোমার এখনো অনেক দেরি আছে।’ এ কথা শুনে ওমর (রা.) বললেন, ‘হুজুর! এই মুহূর্ত থেকে জীবনের চেয়েও আপনাকে বেশি ভালোবাসি।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘এবার তুমি মুমিন হতে পেরেছ।’ শুধু ওমর (রা.) নয়, বরং সব সাহাবিই রাসুল (সা.)-কে তাদের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন।

সাহাবায়ে কেরামরা রাসুল (সা.)-কে কেমন ভালোবাসতেন সেটার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় আবু জুহাইফ (রা.)-এর বর্ণনায়। তিনি বলেন, ‘আমি তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পথে রাসুল (সা.)-কে একটি লাল তাঁবুতে দেখেছি। বেলাল (রা.)-কে দেখলাম একটি পাত্রে রাসুল (ষা.)-এর অজুর অবশিষ্ট পানি নিয়ে এলেন। সেই পানি নেওয়ার জন্য সাহাবিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। কে কার আগে নবীজির অজুর পানি নেবে! কেউ সে পানি খাচ্ছে। কেউ গায়ে মাখছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা রাসুল (সা.)-এর অজুর পানি পায়নি তারা এমন মানুষের হাতের সঙ্গে হাত, বুকের সঙ্গে বুক মেলাচ্ছে যারা পানি পেয়েছে।’ (সহিহ বোখারি)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুপারিশ ছাড়া পরকালে আমাদের মুক্তিলাভের কোনো উপায় নেই। তাকে সবকিছু থেকে বেশি ভালোবাসতে হবে। নিজের জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতে হবে। তার সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে। তার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে হবে। তাহলে আশা করা যায় পরকালে তার সুপারিশ লাভ করে জান্নাতে যাওয়া যাবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দানি করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত