অযত্ন-অবহেলার চিত্র কতটা চড় চড় করে, তা চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গনের ‘ন্যায়কুঞ্জ’ বিলক্ষণ করে টের পাচ্ছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এক বছর চার মাস আগে বিচারপ্রার্থী মানুষ ও সাক্ষীদের বিশ্রামের জন্য ৩৫ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হয়েছিল চট্টগ্রামের আদালত প্রাঙ্গনের এই ‘ন্যায়কুঞ্জ’।
বিচারপ্রার্থী মানুষদের দুর্ভোগ লাঘবে তৈরি করা হলেও এটি এখন তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ‘ন্যায়কুঞ্জ’র দুটি টয়লেট, ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। বিচারপ্রার্থীদের বসার অধিকাংশ চেয়ার ভাঙাচোরা। এ ছাড়া এসব চেয়ারে পড়েছে ধুলোবালির আস্তর।
সরেজমিন দেখা যায়, ‘ন্যায়কুঞ্জ’ভবনের দুটি শৌচাগারের অবস্থা একেবারেই ব্যবহারের অযোগ্য। মলমূত্রে পুরো শৌচাগার নোংরা অবস্থায় পড়ে আছে। হাত মুখ পরিষ্কার করার বেসিন ভাঙা ও অপরিষ্কার। শৌচাগারের পুরো ফ্লোর স্যাঁতস্যাঁতে। পুরুষ এবং নারীর দুটি পৃথক শৌচাগারের দরজা খোলা দেখা যায়, বন্ধ আছে পানির কল। ভাঙা সাইফুন ও বেসিন। কমোডের পাশে পড়ে আছে হাতল ভাঙা বদনা। শৌচাগার দুটির উপরিভাগে শুকনো মল জমে আছে। মুখ পরিষ্কার করার বেসিনে পানের পিকসহ নানা আবর্জনা নোংরা পড়ে আছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে শৌচাগার ব্যবহার করতে এক নারী ঢুকেন ন্যায়কুঞ্জে। দরজা খুলেই শৌচাগারের ভেতরের অবস্থা দেখে বমি ভাব চলে আসে ওই নারীর। নাকে কাপড় দিয়ে দ্রুত ন্যায়কুঞ্জ ত্যাগ করেন তিনি।
এ সময় দুই/তিনজন বিচারপ্রার্থীকে ন্যায়কুঞ্জের ভেতরের কয়েকটি চেয়ারে বসতে দেখা গেলেও তাদের বসার জায়গাটি ছিল শৌচাগারের দরজা থেকে অন্তত ১৫ ফুট দুরত্বে। তাদের একজন বলেন, জজ কোর্টে এসেছিলাম জামিনের আবেদন করতে। আইনজীবী বললেন একটু ঘুরে আসতে। বিশ্রামের জন্য ন্যায়কুঞ্জে প্রবেশ করেছি। প্রথমে শৌচাগারের কাছাকাছি বসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রচণ্ড দুর্গন্ধের কারণে বসতে পারিনি। তাই একটু দূরত্বে বসলাম।’
আবদুল হাকিম নামে আরেকজন বলেন, টয়লেটে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবেশ দেখে টয়লেটে ঢুকতে পারিনি। আমার বমি চলে এসেছে। টয়লেট এতটাই নোংরা আর অপরিষ্কার যে কোনও সুস্থ মানুষ এখানে প্রবেশ করলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। আদালতের মতো একটা জায়গায় এমন জঘন্য টয়লেট থাকবে তা কখনো আশা করিনি।’
আদালতে বিচারপ্রার্থী মানুষ ও সাক্ষীদের বিশ্রাম বা বসার তেমন ব্যবস্থা না থাকায় সারাদেশের মতো ২০২৩ সালে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এই ‘ন্যায়কুঞ্জ’গড়ে তোলো আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ভার্চ্যুয়ালি সেটি উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। এটি দেখাশোনার দায়িত্ব জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজিরের। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চট্টগ্রামের ন্যায়কুঞ্জে দুটি শৌচাগার ও একটি ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার তৈরি করা হলেও এসব দেখভাল বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাউকে রাখা হয়নি। পুরুষ শৌচাগারের পাশে থাকা একটি স্টেশনারি দোকান টেন্ডার ছাড়াই বিপুল অংকের টাকা নিয়ে এক ব্যক্তিকে ইজারা দেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক নাজির এনামুল হক।
স্টেশনারি দোকান করার কথা থাকলেও ইজারাদার টয়লেটের পাশেই ‘ফাস্টফুডের’দোকান বানিয়ে নেন। উদ্বোধনের পর থেকে এক বছর পর্যন্ত বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো খাবারের দাম আদায় করতেন তিনি। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই ইজারাদার দোকান ফেলে চলে যান। এরপর থেকে ‘ন্যায়কুঞ্জ’ যেন অভিভাবকহীন।
এই প্রসঙ্গে জানতে রবিবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে একাধিকবার কল করা হলে মোবাইল রিসিভ করেননি চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত নাজির মো. গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা জানান, আদালতে আগত বিচারপ্রার্থীদের আধুনিক নাগরিক সুবিধা সম্বলিত নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিতের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের নতুন ও পুরাতন আদালত ভবনের মাঝখানে ‘ন্যায়কুঞ্জ’নির্মাণ করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে যারা বিচারের জন্য আসেন, দিনভর তাদের অপেক্ষা করতে হয় আদালত চত্বরে কিংবা বাইরে। রোদে পুড়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘদিনের সেই ভোগান্তি লাঘব হতো ন্যায়কুঞ্জে। কিন্তু এটি এখন উক্ত ন্যায়কুঞ্জ বিচারপ্রার্থীদের কাছে ‘অস্বস্তিকর’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা এটির পাশ দিয়েও যেতে চান না। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক শাখার চরম অবহেলা ও গাফিলতির শিকার এই ন্যায়কুঞ্জ।
আহমদ ছফা নামে এক বিচারপ্রার্থী বলেন, ‘আদালত ভবনের ভেতরে বসার কোনো জায়গা নেই। ন্যায়কুঞ্জ তৈরি করা হয়েছিল বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে কোর্টে আসেন। আইনজীবীর কাছে সাক্ষাতের জন্য গেলেও সেখানে বসার জায়গা কম, মক্কেল বেশি। ন্যায়কুঞ্জে বিশ্রাম নিতে গিয়েও বিপাকে পড়ছে মানুষ। নোংরা পরিবেশ দেখে চলে যাচ্ছেন তারা। এ ক্ষেত্রে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন নারী, অসুস্থ ব্যক্তি এবং শিশুদের মায়েরা।
চা শ্রমিকদের বাগানের মদের পাট্টা ভাঙার পরামর্শ দিলেন সারজিস আলম
মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক
ব্যাংকে টাকা না পেয়ে অগ্নিসংযোগ ডাকাতদের
সাবেক এমপি হেনরীর জমি-ফ্ল্যাটসহ ৫৮ কোটি টাকা ক্রোকের আদেশ
সরকারি সার-বীজ বিক্রির সময় কৃষি কর্মকর্তাকে ধরলেন জনতা