বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করা নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। গতকাল রবিবার ভারতের রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রণালয়ে তলব করে পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন এই উদ্বেগ জানান। পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বলেন, ‘অপরাধশূন্য সীমান্ত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যাতে চোরাচালান, মানবপাচার ও অপরাধীদের চলাচল রোধ করা সম্ভব হয়।’
প্রণয় ভার্মা জানান, নিরাপত্তার জন্য বর্ডার ফেন্সিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে একটি সমঝোতা আছে। দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এর জন্য যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। আমরা আশা করি, যে সমঝোতা হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হবে। অপরাধ প্রতিরোধের জন্য দুপক্ষের মধ্যে সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে বলে আমরা আশা করি।
ভারতীয় হাইকমিশনার যে সমঝোতার কথা বলেছেন তা সঠিক নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ। কারণ সীমান্তে শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের সম্মতির বিধান রয়েছে। বর্তমানে সীমান্তে ভারত যে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেটির কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী সীমান্তে শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে কাঠামো তৈরির সময়ে যৌথ পরিদর্শন, সম্মতি এবং রেকর্ড অব ডিসকাশনে সেটির উল্লেখ থাকতে হয়। এখানে সেটি করা হয়নি।
পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন বলেন, সীমান্তে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত। সম্প্রতি সীমান্তে বাংলাদেশের একজন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে আমরা সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছি।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণে আগামী মাসে (ফেব্রুয়ারি) ভারতের দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
এই বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার কাছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সাম্প্রতিক কার্যকলাপ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সচিব জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের কার্যকলাপ, বিশেষ করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অননুমোদিত চেষ্টা এবং বিএসএফের সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল পদক্ষেপ, সীমান্তে উত্তেজনা ও ঝামেলা সৃষ্টি করেছে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের চেতনাকে ক্ষুণœ করে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন বিজিবি-বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সুনামগঞ্জে বিএসএফের হাতে এক বাংলাদেশি নাগরিকের হত্যার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনারকে। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষকে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে ও সব সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এটিও গুরুতর উদ্বেগের বিষয় যে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ বারবার অপ্রাণঘাতী কৌশল অনুসরণ এবং হত্যা বন্ধ করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন ভারতের সংশ্লিষ্ট সব কর্র্তৃপক্ষকে এমন কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়, যা সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে। পররাষ্ট্র সচিব উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে এ ধরনের সমস্যাগুলো গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুসারে এবং সীমান্তে শান্তি ও স্থায়িত্ব বজায় রাখার উপায়ে সমাধান করা উচিত।
এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে বোঝাপড়া রয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ভারতের বিএসএফ ও বাংলাদেশের বিজিবি সহযোগিতার মাধ্যমে সীমান্তে অপরাধ দমনের বিষয়ে কাজ করবে।
প্রণয় ভার্মা বলেন, ‘আমি পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছি। অপরাধমুক্ত সীমান্ত নিশ্চিতের ব্যাপারে ভারতের প্রত্যয় নিয়ে কথা বলেছি। চোরাচালান, অপরাধীদের চলাচল, পাচারের চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে দমনের বিষয়ে আলোচনা করেছি।’
এর আগে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) সাংবাদিকদের জানান, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো পক্ষ প্রতিরক্ষা সামর্থ্য আছেÑ এমন ধরনের কোনো কাঠামো তৈরি করতে পারবে না। দুদেশের মধ্যে ৪১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৩২৭১ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত। বাকি আছে ৮৮৫ কিলোমিটার। সীমান্তে উত্তেজনার বিষয়টি আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। তারা ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ভেবেছিলাম ভারত এতদিন (সীমান্তে) যে অবৈধ সুবিধা নিয়েছে সেটা আর নেবে না। গেল ৫ আগস্টের পর তারা (ভারত) ওখানে কিছু করেনি। যে কারণে আমরা ভেবেছিলাম তারা আর কিছু করবে না। ভেবেছিলাম তারা এতদিন যে অবৈধ সুবিধা নিয়েছে, সেটা আর করবে না।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণ ও উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের এ পর্যন্ত মোট চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ সবের মধ্যে একটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫০ গজের মধ্যে কেউ কোনো প্রতিরক্ষা সামর্থ্য কিংবা ডিফেন্স পটেনশিয়ালিটি আছে, এসব জিনিস কেউ রাখতে পারবে না। এছাড়া শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে গেলে একে অপরের থেকে সম্মতি নিতে হবে। কোনো সম্মতি ছাড়া তারা এ কাজটি করতে পারবেন না।
জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, ১৯৭৪ সালে যে বেরুবাড়ী চুক্তি হয়েছিল, তখন ওটা দিয়ে দিয়েছি, আমাদের পার্লামেন্টেও সেটা প্রস্তুত ছিল। আর ভারত আমাদের এই প্যাসেজটা দেওয়ার কথা ছিল, ওখানে যাওয়ার করিডরটা। ওটা সারা জীবনের জন্য আমাদেরই থাকবে। আমরা দিয়ে দিলেও তারা পার্লামেন্টে সেটা অনুমোদন করেনি, জায়গাটা আমাদের দেয়নি। আগে তারা এক ঘণ্টা খুলত, একটা ঘণ্টা বন্ধ করত, তারপরে ছয় ঘণ্টা খুলত, ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকত, রাতে পুরোটাই বন্ধ থাকত। ২০১০ সালের চুক্তি করা হয়েছিল, তখন বলা হয়েছিল, এটা পুরোটা সমসময় খোলা থাকবে, আমরা ব্যবহার করতে পারব। কিন্তু এটির বদলে একটি বিরাট ঝামেলা করা হয়েছে। আঙ্গরপোতা ও দহগ্রামের জিরো লাইন থেকে যে ১৫০ গজ দূরে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কথা, সেটা তারা করতে পারবে। এজন্য এখানে বড় ধরনের একটা সমস্যা হয়েছে। আর বিজিবির সঙ্গে আমাদের জনগণ শক্ত অবস্থান নেওয়ায় অন্যান্য জায়গা থেকে তারা কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এই জন্য আমি বিজিবি ও বাংলাদেশের জনগণকে অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও ধন্যবাদ জানাই, তারা কাজটি ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বর্তমানে সীমান্তে ভারতীয়দের কাজ বন্ধ রয়েছে। তিন বিঘা করিডর, নওগাঁর পত্নিতলা, লালমনিরহাট সীমান্ত যে কয়েকটি জায়গায় তারা কাজ শুরু করেছিল, সবগুলোই বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, গেল ৫ আগস্টের পর তারা ওখানে কিছু করেনি, যে কারণে আমরা ভেবেছিলাম তারা আর কিছু করবে না। ভেবেছি, তারা এতদিন যে অবৈধ সুবিধা নিয়েছে, সেটা আর নেবে না। আগামী মাসে ডিজি পর্যায়ের একটা বৈঠক আছে, সেখানে আলোচনা হবে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে যাতে এটা বন্ধ করা যায় সেটা আশা করছি। তাদের এই কাজগুলো করতে দেবেন কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তাদের এই কাজগুলো আমরা করতে দেব না। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে তিনবিঘা করিডরের ভেতরে যে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ওদের পুরো পেটের মধ্যে। চারদিকে ওরা, মাঝখানে আমরা। কেবল আমাদের সরু একটা পথ আছে। কৌশলে এ বিষয়গুলো দেখতে হবে।
