কোন পথে হাঁটবে তেহরান!

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:০১ এএম

দুই দশকের বেশি সময় ধরে পাশ্চাত্যের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক প্রধানত দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বিকাশকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে ইরানকে পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা চালিয়ে আসছে পশ্চিমা দেশগুলো। আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাই আবারও আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। সেই সঙ্গে নিরাপত্তার হুমকি বৃদ্ধি পাওয়ায় পারমাণবিক বোমা না বানানোর বিষয়ে তেহরানের ঘোষিত নীতিতেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে তেহরানকে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক নাইসান রাফাতি বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরানে দুটি ঘরানা আছে। এক পক্ষ পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনার বিষয়ে উন্মুক্ত। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলেছে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। ফলে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি চাঙা করার লক্ষ্যে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী প্রথম পক্ষ। তবে অন্য পক্ষ পারমাণবিক বোমা তৈরির বিষয়ে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতায় ক্ষয় এবং নিজেদের আঞ্চলিক মিত্রদের করুণ অবস্থার কারণে দ্বিতীয় পক্ষের এমন অবস্থান। করুণ অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে থাকা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার পাশ্চাত্যের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা বাড়াতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো আবাস আসলানি আল জাজিরাকে বলেন, চলতি বছর বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গতিপথকে আরও স্পষ্ট করবে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা প্রোগ্রামের উপপ্রধান এলি গেরানমায়েহ বলেন, পরিস্থিতি এবার প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের চেয়ে ভিন্ন রকম হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যেই নীতি গ্রহণ করুক না কেন, ইউরোপীয় দেশগুলো এবার সেগুলো অনেক বেশি মেনে চলতে পারে। ফলে ইরান নিজেদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে পরিবর্তিত পথে হাঁটতে পারে।

২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের আরোপ করা অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ শিথিলের বিনিময়ে ইরান ইউরেনিয়াম পরিশোধন কার্যক্রম সীমিত করতে সম্মত হয়। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে সরে আসেন। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার এক বছর পর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা বাড়ানো শুরু করেছিল ইরান। ইসরায়েল দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং আন্তর্জাতিক নিন্দার পরও দেশটি সেই প্রক্রিয়া বজায় রেখেছে। এরই মধ্যে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইউরোপীয় তিন পরাশক্তি ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং জার্মানির সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইরান। সোমবার এক প্রতিবেদনে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, গত বছরের নভেম্বরে তেহরান এবং ই-৩ নামে পরিচিত এই তিন ইউরোপীয় দেশের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসেছে দেশগুলো।

এদিকে, ইরানের সেনাবাহিনীর উচ্চ প্রশিক্ষিত দল বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী এক হাজার নতুন ড্রোন হাতে পেয়েছে। গতকাল সোমবার দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম এক প্রতিবেদন এই তথ্য জানিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামনের দিনগুলোতে ‘চিরশত্রু’ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসনের বাড়তি চাপ মোকাবিলায় এই ড্রোনের ব্যবস্থা করেছে আইআরজিসি। এরই মধ্যে ইরানের বিভিন্ন স্থানে ড্রোনগুলো পাঠানো হয়েছে।

নতুন এই ড্রোনগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন ড্রোনগুলোর পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। উচ্চ বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন চালকবিহীন এসব ড্রোন প্রতিপক্ষের রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম। এগুলো ইরানি বাহিনীর নজরদারি ও সীমান্ত প্রহরার পাশাপাশি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে। এই ড্রোনগুলো ইরানেই উৎপাদন করা হয়েছে। এতে কাজ করেছেন সামরিক বাহিনীর সদস্য, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকরা। এর আগে গত সপ্তাহে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্য রাজওয়ান নামের নতুন একটি আত্মঘাতী ড্রোন উন্মোচন করেছে।

চলতি বছরের শুরু থেকে দুই মাস ব্যাপী সামরিক মহড়া শুরু করেছে ইরান। এই মহড়ার অংশ হিসেবে নাতাঞ্জ এলাকায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাকে ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষিত রাখার মহড়া চালিয়েছে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। তারা এই মহড়ায় নতুন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত