সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ইসলাম

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:২৭ এএম

সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মানবিক কারণে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে সেটিকে বলা হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। যেমন বিপদাপদে একে অপরকে সাহায্য করা, একে অন্যের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, ঝগড়া-বিবাদ না করে মিলেমিশে বসবাস করা ইত্যাদি। এটি ইসলাম সমর্থন করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানবজাতি, তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি একজন (আদম আ.) থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকে (হাওয়া আ.) সৃষ্টি করে তাদের উভয় থেকে বহু নর-নারী (পৃথিবীতে) ছড়িয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা নিসা ১)

সুতরাং এক আদম (আ.)-এর সন্তান হিসেবে সব মানুষের পৃথিবীতে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার রয়েছে। কারও প্রতি কারও জুলুমের অধিকার নেই। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করে, তার কোনো ক্ষতি করে, তার ওপর অযাচিত বাধ্যবাধকতা আরোপ করে বা তার কোনো কিছু জবরদখল করে, কেয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠব।’ (সুনানে আবু দাউদ ৩০৫১) কিন্তু স্মরণ রাখা চাই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি এক নয়। দুটিতে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি মানে ধর্মে ধর্মে মিলে যাওয়া। এক ধর্মের বিষয়কে আরেক ধর্মের বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা। ইসলাম কখনো সেটা সমর্থন করে না। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না।’ (সুরা বাকার ৪২) অর্থাৎ ইহুদিবাদ, খ্রিস্টবাদ কিংবা কুফর-শিরককে ইসলামের সঙ্গে এক করো না। কারণ আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মমতে ইবাদত করলে মহান আল্লাহ সেটি কবুল করবেন না। তাই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি কথাটি বাতিল। অমুসলিমদের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন মুসলিমদের জন্য নয়, তেমন মুসলিমদের কোনো অনুষ্ঠানও তাদের জন্য হতে পারে না।

ইসলাম ইনসাফের ধর্ম। ইসলামে জুলুমের কোনো স্থান নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সা.) মদিনা রাষ্ট্র গঠনকালে সেখানে তিনটি সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস ছিল। মুসলিম, ইহুদি ও মুশরিক। তিনি সবাইকে নিয়ে সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে সংখ্যালঘুরাও নিজেদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ করেছিল। প্রত্যেকের জানামাল, ইজ্জত-সম্মান (বিদ্রোহ বা কোনো অপরাধ না করা পর্যন্ত) সংরক্ষিত ছিল। এমনকি সবচেয়ে নিকৃষ্ট সম্প্রদায় মুনাফেকরাও সেখানে নিরাপদে বসবাস করত। তাই ইসলামকে সাম্প্রদায়িক ধর্ম আখ্যা দেওয়ার উদ্দেশপ্রণোদিত প্রচারণা। মহানবী মুহাম্মদ (সা.) অমুসলিমদের সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করতেন না। তাদের সঙ্গেও তিনি হাসিমুখে কথা বলতেন। বিপদাপদে সাহায্য করতেন। অসুস্থ হলে দেখতে যেতেন। তাদের সঙ্গে কেনাবেচা করতেন। মোট কথা মানবিক সব কাজকাম তাদের সঙ্গে করতেন। হজরত জাবের (রা.) বলেন, ‘একদিন আমাদের পাশ দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তা দেখে রাসুল (সা.) দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরা তাকে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এটা এক ইহুদির লাশ! তখন তিনি বললেন, যখন কোনো লাশ দেখবে তখন দাঁড়াবে।’ (সহিহ বুখারি ১৩১১)

এমন অনেক ঘটনা রয়েছে রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের জীবনে, যা ইসলামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ইতিহাসকে গৌরবময় করে রেখেছে। তাই ইসলাম ও মুসলিমদের সাম্প্রদায়িক বলে প্রোপাগান্ডা চালানো ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তেরোশ বছরের (৬২২-১৯২৪) অধিককাল পৃথিবীকে ইসলামের নবী ও মুসলিমরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ এই সময়টা ছিল ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক। কিন্তু ইসলামি শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের পর বিশ্বব্যাপী দুর্বলের ওপর সবলের, সংখ্যালঘুর ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠের নির্যাতনের যে অমানবিক ধারার সূচনা হয়েছে, বর্তমান দুনিয়ার শাসনব্যবস্থা সেটা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে সংখ্যালঘু হিসেবে সবচেয়ে শারীরিক, মানসিক ও আদর্শিক নির্যাতনের শিকার মুসলিমরা। কিন্তু হতবাক করার বিষয় হলো, মানবতার ধ্বজাধারীরা সেসব নিয়ে কখনো কথা বলে না। উদ্বেগ জানায় না। কিন্তু বাংলাদেশে তথাকথিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থাগুলো খুব তৎপরতা দেখায়। নানা মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের তকমায় ভূষিত করে। এর কারণ আসলে স্পষ্ট। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে বিশ্বের সব থেকে বেশি মসজিদ-মাদ্রাসা ও আলেম-ওলামা রয়েছে। এ দেশের মুসলিমরা বেশি ধার্মিক। তাই এদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে মুসলিমদের ভয়-উৎকণ্ঠার মধ্যে রেখে ফায়দা লোটার পাঁয়তারা চলে। বলা যায়, ইসলাম ও মুসলিমদের বিশ্বব্যাপী হেয় করার ট্রামকার্ড এটি। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই শত্রুরা যাতে আমাদের ধর্মকে কলুষিত করতে না পারে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার তওফিক দান করুন। আমাদের মাতৃভূমিকে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত