চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ

খালপাড়ে তিন উপদেষ্টা, মিলবে কি সমাধান? 

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:৩৫ এএম

খালপাড়ে এবার অন্তর্বর্তী সরকারের তিন উপদেষ্টা। চট্টগ্রামের প্রধান দুর্ভোগ বলে বিবেচিত জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে ১১ বছর আগে নেওয়া চার প্রকল্পে ১৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকার মধ্যে ৮ হাজার ৩১২ কোটি টাকা খরচ হলেও বর্ষা এলেই পানিতে ডুবে চট্টগ্রাম মহানগরী। মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সিডিএ চেয়ারম্যান কিংবা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পরিবর্তন হলেও জলাবদ্ধতা দুর্ভোগের কোনো পরিবর্তন নেই। সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন ধারায় যুক্ত হচ্ছে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ।

বিগত আওয়ামী লীগ, তত্ত্বাবধায়ক ও বিএনপি সরকারের সময়েও এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পায়নি নগরবাসী। এবারের অন্তর্বর্তী সরকারেও কি একই দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে নগরবাসীর জন্য?

এই প্রশ্ন উত্থাপনের আগেই চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন নিয়ে বর্ষা আসার আগেই গত ৫ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির নিজ মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল সেগুলো সম্পর্কে অবগত হন।

শনিবার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বাকি দুই উপদেষ্টা নিয়ে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার চিত্র সরেজমিনে দেখতে খালপাড়ে এসেছেন। শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের খাল খনন ও সংস্কারে চলমান প্রকল্পগুলো দেখে  রবিবার (১৯ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসছেন। আর এখান থেকেই আগামীর কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি সম্পূর্ণ মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ। খাল দখল করে ভবন নির্মাণ কিংবা পাহাড় কাটার কারণে বালি মাটিতে নালা খাল ভরাট হয়ে যাওয়া, খালের মধ্যে ময়লা আবর্জনা ও পলিথিন ফেলে খালকে ভরাট করার সব কাজই আমরা মানুষ করেছি। তাই এর সমাধানও আমাদেরই করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, খালগুলোর চিত্র দেখা হয়েছে। আজন রবিবার সার্কিট হাউসে আমরা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করবো। সেখানে আগামী মার্চের মধ্যে কার কী কাজ হবে তা ভাগ করে দেওয়া হবে। যদিও কেউ করতে না পারে তাহলে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগের দায় সেই সংস্থাকে নিতে হবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ফাওজুল কবির বলেন, এবার যে জলাবদ্ধতা পুরোপুরি কমে যাবে তা কিন্তু নয়। তবে এই দুর্ভোগ কীভাবে কমিয়ে আনা যায় আমরা সেই চেষ্টা করবো। 

একই মন্তব্য করেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, খাল ও নালাগুলো পলিথিন ও আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। আমরা সবাই যদি পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করে দেই, পাহাড় কাটা যদি বন্ধ করে দেই তাহলে নালা ও খাল ভরাট বন্ধ হয়ে যাবে। একইসাথে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগও কমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা নগরীর তিনটি খাল (আবেদীন কলোনী, মুরাদপুর মির্জাখাল ও কল্পলোক আবাসিক এলাকায় বাকলিয়া খাল) দেখলাম, সব খালেই একই ভরাটের চিত্র। এতে খালগুলোর পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া আরেকটি ঘটনা ঘটেছে সেগুলো হলো খালের জায়গা নিজের নামে রেকর্ড করে সেখানে ভবন নির্মাণ করেছে।

দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, রবিবার চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের বক্তব্য শুনবো। তাদের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। আমরা জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ কমিয়ে আনতে এবার বর্ষার আগ থেকেই কার্যক্রম শুরু করেছি।

কিন্তু চট্টগ্রামে যতোই পরিকল্পনা নেওয়া হউক না কেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন জলাবদ্ধতা নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করে।

বিগত সময়ে এই দুই সংস্থার রেশারেশির কারণে নগরবাসী আরো বেশি জলাবদ্ধতা দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। এবারো একই চিত্র হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির বলেন, না এবার সেই সুযোগ নেই। আমরা এবার সব সংস্থাকে নিয়ে মাঠে নেমেছি। যার যার কাজ তাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি কোনো কাজ না হয় তাহলে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগের দায় সেই সংস্থাকে নিতে হবে। 

সমন্বয়হীনতা বিষয়ে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত রেগুলেটরগুলো পরিচালনার বিষয়ে নির্দেশনা কী? পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জনবলের বিষয়টি পলিসিগত বিষয়। আর সমন্বয় প্রশ্নে আমরা সিডিএ সিটি কর্পোরেশন একত্রিতভাবে কাজ করছি। তবে এখন অগ্রাধিকার হচ্ছে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ কমিয়ে আনা।

অন্যান্য বছর যেখানে বর্ষার প্রারম্ভে সরকারের টনক নড়ে, এবার বছরের শুরুতেই সোচ্চার অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টাগণ। একইসাথে জলাবদ্ধতা নিরসনে নিয়োজিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তারাও।

 সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার এই উদ্যোগকে পজিটিভ দেখছেন বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও সিডিএ’র বোর্ড সদস্য স্থপতি জেরিনা হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার বর্ষার অনেক আগ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মনিটরিং হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। জলাবদ্ধতা যাতে কম হয় অবশ্যই এই বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। তবে সরকারের পাশাপাশি আমাদের জনগণেরও দায় আছে। সরকার সরকারের কাজ করছে আমরা জনগণও আমাদের কাজ করতে হবে। নালা ও খালগুলো ভরাট এবং দখল কিন্তু আমরাই করছি।

উল্লেখ্য চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৪ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নেওয়া এই প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। সিডিএ’র এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড (ইসিবি)। ইতিমধ্যে প্রকল্পের কাজের ৭৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। ১১ বছর আগে অনুমোদন পাওয়া ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় বাস্তবায়নাধীন বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্পের কাজটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্বাবধানে হচ্ছে, গত জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। কর্ণফুলী নদীর তীর হয়ে কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যানিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত