জুনের মধ্যে বকেয়া শোধে পিডিবিকে আদানির চিঠি

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:২৪ এএম

বহুল আলোচিত-সমালোচিত ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি আদানি গ্রুপ এবার জুনের মধ্যে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে নতুন সময় বেঁধে দিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) চিঠি দিয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করা না হলে চুক্তি অনুসারে পিডিবিকে বিলম্ব ফি দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে আদানি।

এর আগে গত বছর ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দিয়েছিল তারা। বকেয়া আদায়ে ওই সময় একটি ইউনিট থেকে উৎপাদনও বন্ধ করে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

গতকাল রবিবার পিডিবিকে পাঠানো আদানির চিঠিতে বলা হয়েছে, ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ করা বিদ্যুতের বিল হিসেবে পিডিবির কাছে তাদের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার।

তবে পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের হিসাবে আদানির পাওনা ৭০ কোটি ডলারের মতো। কারণ বিলে কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ আছে। চুক্তিতে উল্লিখিত সূত্র অনুসারে কয়লার দাম হিসাব করছে আদানি। আর কয়লার প্রকৃত দাম ধরে বিল হিসাব করছে পিডিবি। পুরনো বকেয়া জমলেও এখন নিয়মিত বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।

ভারতের ঝাড়খ-ে অবস্থিত কেন্দ্রটির দিনে দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। গত নভেম্বরে একটি ইউনিট বন্ধ করার পর বিল পরিশোধে সমঝোতা হয়। এরপর বন্ধ ইউনিট চালু করে আদানি। বিল পরিশোধে নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খোলে পিডিবি। এ ঋণপত্রের অধীনে এখন বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। শীতে চাহিদা কম থাকায় বর্তমানে একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানি।

পিডিবি সূত্র বলছে, ৯ জানুয়ারি আদানি ও পিডিবির প্রতিনিধিদলের মধ্যে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই বকেয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এর ভিত্তিতেই এখন আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে আদানি গ্রুপ।

বৈঠকে আলোচনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে ১৬ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত আদানির চিঠিতে। এতে বলা হয়েছে, বকেয়া শোধ না হওয়ায় তারল্যসংকটে ভুগছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের বকেয়া বিল ৩০ জুনের মধ্যে শোধ করা হলে বিলম্ব ফি মওকুফ করার প্রস্তাব করেছে আদানি। পিডিবি ও আদানির স্বার্থে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধের অনুরোধ করেছে তারা।

এর আগে পিডিবির প্রতিশ্রুতি অনুসারে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে ঋণপত্র খুলে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে গত বছর ২৮ অক্টোবর একটি চিঠি দেয় আদানি। এর মধ্যে তা করতে না পারায় ৩১ অক্টোবর একটি ইউনিট বন্ধ করে দেয় আদানি।

আদানির বকেয়া নিয়ে এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরকার মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। তাদের যে বকেয়া আছে সেটা ধীরে ধীরে পরিশোধ করার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। ইতিমধ্যে কিছু বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। এরপরও যদি তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয় তাহলে আমরা বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করব। আমরা কোনো বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে দেশকে জিম্মি হতো দেব না।’

তিনি বলেন, ‘এটা কোনো জাতীয় ইস্যু নয়। পিডিবি আদানিকে ব্যবসা দিয়েছে। আদানি বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ পিডিবির কাছে টাকা পাবে। এটা তো একটা ব্যবসা। এখন ব্যবসায়িক এই বিষয়টি তো পিডিবি আর আদানির ব্যাপার।’

ফাওজুল কবির আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া পরিশোধে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে তো শুধু আদানি নয়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিপিসির তেল সরবরাহকারী রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই দেশে যাতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি স্বাভাবিক রাখা যায় সেই পরিকল্পনা করে আমরা এগোচ্ছি।’

পিডিবি সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বকেয়ার অর্থ আদায়ে আগের চেয়ে তৎপরতা বাড়িয়ে দেয় আদানি। বাংলাদেশকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে আদানি। একপর্যায়ে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানিতে আদানির নামে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কথা থাকলেও ডলার সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন পিডিবির পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়। এরই মধ্যে ৩১ অক্টোবর থেকে ১৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ করে দেয় আদানি।

এর আগে বকেয়া বিল না পেলে গত বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) থেকে আদানি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া খবর প্রকাশ করেছিল গত ৩ নভেম্বর। যদিও আদানি গ্রুপের পক্ষ থেকে ওই খবর সঠিক নয় দাবি করে তখন দেশ রূপান্তরকে বলা হয়েছিল, উল্টো তারা আরও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে চান।

আদানি জানিয়েছিল, ৭ নভেম্বরের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ডলার বকেয়া পরিশোধ করার কোনো আলটিমেটাম পিডিবিকে দেননি তারা। বকেয়া আদায়ের জন্য পিডিবির সঙ্গে আলোচনা চলছে। দুপক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চায় আদানি।

তবে পিডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, আদানির পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ বন্ধের আলটিমেটাম দিয়ে পিডিবিকে একটি ইমেইল করা হয়েছিল।

আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগেই কয়লার দাম ও চুক্তির শর্ত নিয়ে দেশ-বিদেশে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। একপর্যায়ে পিডিবির পক্ষ থেকে আদানিকে কয়লার চড়া দাম দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দাম কমাতে রাজি হয় আদানি। পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে কম দামে কয়লা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। তবে এক বছর পর এখন আবার ২২ শতাংশ বাড়তি দাম চাইছে আদানি।

পিডিবি সূত্রমতে, পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতি টন কয়লার দাম নিচ্ছে ৭৫ মার্কিন ডলার। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে টনপ্রতি কয়লার দাম ৮০ ডলারের কম। আর আদানি প্রতি টন কয়লার দাম চাইছে ৯৬ ডলার। যদিও আদানির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত