বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:৩৩ এএম

দ্বিতীয় বারের মতো হোয়াইট হাউজে ফিরেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছরের নভেম্বরের ভোটে জয়ের পর গতকাল সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। প্রথম দিনেই বেশ কিছু নির্বাহী আদেশে সইও করেছেন ট্রাম্প। যার ফলে বড় প্রভাব পড়বে দেশটি স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন নীতিসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে। অবশ্য ট্রাম্পের এ প্রত্যাবর্তন কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই না, প্রভাব ফেলবে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই তার ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মূলনীতি বাস্তবায়ন শুরু করবেন। এই এজেন্ডা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির খুঁটিনাটি তো পরিবর্তন করবেই, পাশাপাশি এর ফলে পুরো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে। আগামী চার বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হতে পারে, তা নিয়ে একটা বিশ্লেষণী প্রতিবেদন করেছে বিবিসি।

ইউক্রেন যুদ্ধ

নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিভিন্ন বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন যে, তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ‘এক দিনের মধ্যে’ শেষ করতে পারবেন। যদিও সেটি ঠিক কীভাবে করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কখনোই খোলাসা করেননি তিনি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যে কোটি কোটি ডলার সেনা অনুদান দিয়েছে, ট্রাম্প সব সময়ই তার কড়া সমালোচক ছিলেন। ইউক্রেন আর রাশিয়ায় ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ পেতে যাওয়া কিথ কেলোগও সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, আগামী ১০০ দিনের মধ্যে এই যুদ্ধ থামানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন তার সঙ্গে দেখা করতে চান এবং ট্রাম্পের সহযোগীরা ওই বৈঠকের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।

ন্যাটোর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ৩২টি দেশের সামরিক জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো বহুদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চক্ষুশূল। তিনি প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এবারও তিনি ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর শর্ত দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেছেন, যে দেশ প্রতিশ্রুত অর্থ ব্যয় করবে না তারা আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ওয়েবসাইটের বর্ণনা অনুযায়ী তার লক্ষ্য হলো, ন্যাটোর উদ্দেশ্য ও মূলনীতির পুনর্মূল্যায়ন। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোট থেকে তিনি কখনোই সরিয়ে নেবেন কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের দ্বিমত আছে। কিন্তু অনেক বিশ্লেষক মনে করেন জোটের সদস্য হিসেবে থেকেও গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারেন ট্রাম্প।

মধ্যপ্রাচ্য

ট্রাম্প যদিও গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরই প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে যোগ দিচ্ছেন, তবে এর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে তাকে বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়েই যেতে হবে। অর্থাৎ এই যুদ্ধ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করাটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য কঠিন হবে। ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ইসরায়েলের পক্ষে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে দাবি করা ও তেল আবিব থেকে দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধেও তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাড়ায় ও ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেমানিকে হত্যা করে। সমালোচকদের অনেকের মতে, ট্রাম্পের নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে ও এর ফলে ফিলিস্তিনিরা কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় আব্রাহাম অ্যাকর্ডের প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করেন এবং ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান আর মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চালান। তবে, ওই চুক্তিতে আরব দেশগুলোর শর্ত ছিল যে ভবিষ্যতে ইসরায়েল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে, যে শর্ত সেবারও মানা হয়নি।

চীন

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকাকালীন চীনের সঙ্গে একপ্রকার বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এই দফায়ও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তিনি যাদের নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন সেই মার্কো রুবিও ও মাইক ওয়াল্টজ দুজনকেই চীনের প্রতি কঠোর মনোভাবসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, তাইওয়ানও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ানকে সেনা সহায়তা দিয়ে এসেছে, যেখানে চীন তাইওয়ানকে দেখে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে যেটি চীন থেকে বর্তমানে বিচ্ছিন্ন হলেও ভবিষ্যতে বেইজিংয়ের অধীনে থাকবে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চীন যদি তাইওয়ান অবরোধ করার চেষ্টা করে তাহলে চীনের ওপর আরও কঠোর কর আরোপ করা হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন

ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণার বিরোধী হিসেবে পরিচিত। গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ধারণাকে এর আগে জালিয়াতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে তিনি ফের যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিতে পারেন। জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য হুমকি।

অভিবাসন

যথাযথ অনুমোদন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রতিশুতি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের এবারের নির্বাচনী প্রচারণার একটি অন্যতম প্রধান অংশ। হোয়াইট হাউজে বসে প্রথম দিন থেকেই তিনি ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ বিতাড়িত কর্মসূচি’ শুরু করবেন। এমনকি জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের বিধানও পরিবর্তন করার লক্ষ্য আছে ট্রাম্পের। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে, বেশ কিছু দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটকের আনাগোনাও নিষিদ্ধ করবেন তিনি। এর অনেকগুলো দেশই ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।

গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খাল

গ্রিনল্যান্ড কিনতে চেয়ে ও পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাওয়ার মন্তব্য করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। আগের দফায় প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ও ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে চাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে এটি বিক্রি হবে না। ডেনমার্কের অধীনে থাকা গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিষয়ক কার্যক্রমের বড় ঘাঁটি রয়েছে। এ ছাড়া ওই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদও রয়েছে, যা বিভিন্ন হাই-টেক যন্ত্রপাতি ও ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত