নবীজির সুপারিশ লাভ করবেন যারা

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:০৪ এএম

মানুষের প্রতি মহানবী (সা.) অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। কেউ কোনো দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে এবং আজাব-গজবে পড়বে, এটি তিনি সহ্য করতে পারতেন না। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের যেকোনো কষ্ট তার কাছে অতি পীড়াদায়ক। তিনি সর্বদা তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ও পরম দয়ালু।’ (সুরা তওবা ১২৮) বস্তুত আমরা নিজেদের যতটুকু ভালোবাসি, মহানবী (সা.) তার চেয়েও বেশি আমাদের ভালোবাসেন।

উম্মতের প্রতি মায়া-মমতা : উম্মতের প্রতি মহানবী (সা.)-এর চূড়ান্ত কল্যাণকামিতা ও নিখাদ ভালোবাসা বেশ কিছু হাদিসে প্রকাশ পায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘আমার ও মানুষের উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালিয়েছে। আগুন চারপাশ আলোকিত করলে কীটপতঙ্গ এসে ভিড় জমাতে থাকে। পতঙ্গগুলো আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর ওই লোক সেগুলোকে সেখান থেকে তুলে সরিয়ে ফেলে। সেগুলো আবার সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই লোক আবার সেগুলোকে আগুন থেকে উদ্ধার করে। আমি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাধা দিই। আর মানুষ সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’ (সহিহ বুখারি)

আখেরাতের কঠিন মুহূর্তে সুপারিশ : আখেরাতের কঠিন মুহূর্তেও এ উম্মতের মুক্তির সুপারিশ করবেন মহানবী (সা.)। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীকে এমন একটি বিশেষ দোয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে, যা কবুল করা হবে। তারা (দুনিয়াতে) সে দোয়া করেছেন এবং তা কবুলও করা হয়েছে। আর আমি আমার দোয়া কেয়ামতের দিন আমার উম্মতের সুপারিশের জন্য গোপন করে রেখেছি। আমার উম্মতের মধ্যে যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে ইনশাআল্লাহ আমার সুপারিশ লাভ করবে।’ (সহিহ মুসলিম)

ইমাম নববী (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ হাদিসে উম্মতের প্রতি রাসুল (সা.)-এর পূর্ণ মায়া-মমতা ও দরদের কথা ফুটে উঠেছে। তাই তো তিনি এই উম্মতের জন্য তার বিশেষ দোয়া তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য তুলে রেখেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে নবী, আপনি লোকদের বলে দিন, যদি তোমরা প্রকৃতই আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে তোমরা আমাকে অনুসরণ করো। তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন। আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান ৩১)

কাজেই আল্লাহর নির্দেশ পালন করার সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর আদেশও পালন করতে হবে এবং তার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে তার সুন্নত পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। মহানবী (সা.)-এর সব নির্দেশ, কথা, কাজ ও সমর্থনকে সুন্নত বলা হয়। আর এই সুন্নতসমূহকে নিজেদের জীবনে ধারণ ও পালন করার অর্থই হলো তার সুন্নতের অনুসারী হওয়া। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নত এবং আমার হেদায়েতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নত অনুসরণ করবে। তোমরা তা কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরবে।’ (আবু দাউদ ৪৬০৭)

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নত অনুসরণ করে, তারাই মূলত আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসবে সে অবশ্যই আমার সঙ্গে জান্নাতে প্রতিবেশী হবে।’ (তিরমিজি ২৭২৬) সুতরাং তাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে হবে। যার ভেতর মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসা থাকবে না, সে কোনো দিন প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তানসন্ততি ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হব।’ (সহিহ বুখারি ১৫)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়।’ (সুরা আহজাব ৬) এক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.) ওমর (রা.)-কে বললেন, ‘হে ওমর! তুমি কি আমাকে তোমার জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসো?’ জবাবে ওমর বললেন, ‘হে রাসুল! আমি আমার সম্পদ, সন্তান, বাবা-মা সবার চেয়ে আপনাকে বেশি ভালোবাসি। তবে আমার জীবনের চেয়ে বেশি এখনো আপনাকে ভালোবাসতে পারিনি।’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘তাহলে মুমিন হতে তোমার এখনো অনেক দেরি আছে।’ এ কথা শুনে ওমর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ মুহূর্ত থেকে জীবনের চেয়েও আপনাকে বেশি ভালোবাসি।’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘এবার তুমি মুমিন হতে পেরেছ।’ (সহিহ বুখারি)

সাহাবিদের মনে ছিল মহানবী (সা.)-এর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। তিনি তাদের যখন যে বিষয়ে আদেশ-নিষেধ করেছেন সঙ্গে সঙ্গে তারা সে বিষয়ে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। তারা অনুসরণ করেছেন মহানবী (সা.)-এর প্রতিটি কথা, কাজ ও আদেশ-নিষেধের। তার আনুগত্য প্রকাশে বিন্দুমাত্রও কমতি করেননি সাহাবিরা। তাদের পুরো জীবনই ছিল নবীপ্রেমের প্রতিচ্ছবি। ইবাদত-বন্দেগি, লেনদেন, চলাফেরা, আখলাক-চরিত্র থেকে শুরু করে জীবনের সর্বত্রই ছড়িয়েছিল তার সুন্নতের জ্যোতি। নবীপ্রেম তাদের জীবনকে করেছিল জ্যোতির্ময়। নবীপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করে গেছেন, মানব ইতিহাসে সেটার দৃষ্টান্ত নেই। মহানবী (সা.)-কে সাহাবায়ে কেরামের মতো ভালোবেসে আমরাও হতে পারি সৌভাগ্যশালী আলোকিত মানুষ। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তওফিক দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত