সরকারি নির্মাণকাজের নিরীক্ষাসংক্রান্ত শিক্ষাসফরে জাপান যাওয়ার জন্য গত ১২ জানুয়ারি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হয় ১৫ জন অডিটরের একটি দল। তাদের মধ্যে ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার জি এম মামুনুর রশিদকে জাপান যেতে দেয়নি ইমিগ্রেশন পুলিশ। দুর্নীতির মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ায় তাকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু ওই ফ্লাইটেই এমন দুজন অডিটর ছিলেন যাদের দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে বা তদন্ত চলমান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনাটি ২০১১ সালের। জি এম মামুনুর রশিদ ঢাকার রেলওয়ে ভবনে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) পদে কর্মরত থাকলেও চট্টগ্রাম রেলওয়ের হিসাব বিভাগের নিয়োগসংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। কমিটির কাজ ছিল রেলওয়ের জন্য তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করা। এই কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা অর্থের বিনিময়ে কর্মচারী নিয়োগ করেছিল। প্রশ্নফাঁস করে সংশ্লিষ্টদের নিয়োগ পেতে সহায়তার অভিযোগও ছিল। এসব অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় মামলা করে। মামলাটি চট্টগ্রামের বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। মামুনুর রশিদ এ মামলার চার্জশিটভুক্ত। তবে ২০২৩ সালে অভিযুক্ত মামুনুর রশিদকে বিভাগীয় তদন্তে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এখনো দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে দায়মুক্তি দেয়নি। এ অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় তাকে শুধু চাকরিবিধি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
১৪ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত জাপানে ছিল শিক্ষাসফর। ১২ জানুয়ারি থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে (টিজি-৩২২) জাপান যাওয়ার জন্য দলের সবাই যখন বিমানবন্দরে, তখন আটকে দেওয়া হয় জি এম মামুনুর রশিদের যাত্রা। ইমিগ্রেশন পুলিশের সাফ কথা, আপনার বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট রয়েছে। আপনি যেতে পারবেন না। কমিটির অন্য সদস্যরা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। বিমানবন্দর থেকেই তারা তাদের হাই-অফিশিয়ালদের বিষয়টি জানান। কিন্তু দুদকের মামলা হওয়ায় কেউই খুব একটা জোরালো ভূমিকা নিতে সাহস করেননি। শেষপর্যন্ত কেঁচো খুড়তে সাপ বের হয় কি না সেই চিন্তায় যার যার মতো যাত্রার প্রস্তুতি নেন। অন্যরা জাপানমুখী ফ্লাইট ধরলেও মামুনুর রশিদকে বাড়ি ফিরতে হয়। সফর শেষে অডিট দলটির আজ দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
জি এম মামুনুর রশিদ বর্তমানে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার পদে কর্মরত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে ইমিগ্রেশন থেকে বলা হয়েছে, আপনার বিষয়ে কিছু অবজারভেশন আছে, আপনি বিদেশে যেতে পারবেন না। কিন্তু কী বিষয়ে অভিযোগ তা জানায়নি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। তবে আমি পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, আমার চাকরি জীবনের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ রেলওয়ের হিসাব বিভাগে নিয়োগ পরীক্ষায় আমিসহ বেশ কয়েকজন অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। সেই বিষয়ের মামলায় আমি আদালত থেকে জামিনও নিয়েছি। এরপর স্বাভাবিক চাকরি করছি। কিন্তু হঠাৎ করে কেন এ বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে আমি জানি না।’
মামুনুর রশিদ বাড়ি ফিরলেও ওই ফ্লাইটে গেছেন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট ডিরেক্টরেটের ডিজি শেখ মোহাম্মদ ওমর ফরুক। তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। দুদক উপপরিচালক খায়রুল হককে শেখ মোহাম্মদ ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার একটি অভিযোগ অনুসন্ধান করে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। এ ছাড়া অডিট দলে রয়েছেন গত নভেম্বরে জার্মানিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে অডিট করতে গিয়ে নানা অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে অভিযুক্ত অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সোহেল আহমেদও। তার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও সরকারি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে অডিট কর্তৃপক্ষ।
দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাবিরোধী অভিযোগ রয়েছে এমন কর্মকর্তাদের বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ সফরে কেন পাঠানো হচ্ছে, জানতে চাইলে ডেপুটি কম্পট্রোলার অব অডিটর জেনারেল সিএজি মো. শরীফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জি এম মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে অনেক আগের একটি অভিযোগ ছিল। তার বিদেশ যাওয়ায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল কি না, তা আমাদের জানা ছিল না।’
আর অন্য বিতর্কিতদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে অতিসম্প্রতি। আর শিক্ষাসফরের তালিকা অনেক আগেই প্রস্তুত করা হয়েছিল।’
বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ একজন অভিযুক্তকে আটকে দিলেও আরও দুজনকে কেন ছেড়ে দিল, জানার চেষ্টা করা হয়েছিল ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে। কিন্তু তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে গত ২০ জানুয়ারি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করেছে দুদক। একই সঙ্গে অডিট কমকর্তা জি এম মামুনুরের বিষয়ে বিভাগীয় সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে বিধিবদ্ধ এ সংস্থা।
