বিদেশিদের আরও বিনিয়োগের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৫:৩৮ এএম

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করেছে এবং উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে প্রস্তুত।’

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা বলেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম অধ্যাপক ইউনূসের বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় বলছি, বাংলাদেশ বড় আকারে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।’

শফিকুল আলম বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে ড. ইউনূস একাধিক সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন কোম্পানির নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশের কথা তুলে ধরে বিনিয়োগ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছেন এবং আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন যে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত।

প্রেস সচিব আরও বলেন, বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশ একটি রপ্তানি কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জুলাই-আগস্ট নৃশংসতা সম্পর্কে জাতিসংঘ প্রতিবেদন ফেব্রুয়ারিতে :

জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত নৃশংসতা সম্পর্কে জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তা প্রকাশ করা হবে।

সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য শহর দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভার ফাঁকে গত বুধবার বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে জাতিসংঘের হাইকমিশনার এই মন্তব্য করেন।

এ সময় তুর্ক বলেন, জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিস থেকে প্রকাশিত হওয়ার আগে প্রতিবেদনটি বাংলাদেশকেও দেওয়া হবে।

ড. ইউনূস ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধ তদন্তের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ছয়টি প্রধান স্বাধীন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনও প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত হবে। এই প্রতিবেদনগুলো একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা মিয়ানমার থেকে নতুন করে হাজার হাজার শরণার্থীর আগমনের ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আরও খারাপ হওয়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহায়তার জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধানের প্রতি আহ্বান জানান।

এ ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়ে তুর্ক জানান, তিনি এ বিষয়ে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমন বন্ধ করার লক্ষ্যে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি নিরাপদ অঞ্চল তৈরির আহ্বান জানান ড. ইউনূস। তিনি রোহিঙ্গা সংকটের ওপর আসন্ন উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি সবচেয়ে খারাপ মানবিক সংকটগুলোর একটির দিকে বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করবে।

এ বিষয়ে তুর্ক একমত হয়েছেন, এ ধরনের সম্মেলন সংকটের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হারানো মনোযোগ ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ সরকারের এসডিজিবিষয়ক সমন্বয়কারী লামিয়া মোরশেদ এবং জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত তারেক আরিফুল ইসলামও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের তৃতীয় দিন গতকাল ব্যস্ত সময় পার করেন। সকালে ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট নিক ক্লেগ এবং বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুলতান আহমেদ বিন সুলাইমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করেছে এবং উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশে আমরা আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে প্রস্তুত।’

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ২১ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে পৌঁছান ও সম্মেলনে অংশ নেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মহাসচিবের সাক্ষাৎ : গতকাল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (এআই) মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।

এ ছাড়া বিশ্বের বৃহৎ শিপিং কোম্পানি এপি মুলার মার্কসের চেয়ারম্যান রবার্ট মায়ারস্ক উগলা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর।

এদিকে গতকাল সকালে বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি গ্রুপ চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

এ ছাড়া ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট স্যার নিক ক্লেগও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

ফেসবুকে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করার আহ্বান : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে ফেসবুকের মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল সম্মেলনের ফাঁকে মেটার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স প্রেসিডেন্ট নিক ক্লেগের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ধনী ব্যক্তি এবং রাজনীতিবিদরা তার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের লাখ লাখ ডলারের সম্পদ লুট করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন এই ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ ব্যবহার করে বাংলাদেশকে নিয়ে মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে।’

নিক ক্লেগ ইংল্যান্ডের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফেসবুক বাংলাদেশে তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল যাচাই কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুকের তথ্য যাচাই বন্ধের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ এবং ইউরোপের দেশগুলোয় প্রযোজ্য হবে না।

ক্লেগ আরও বলেন, ফেসবুক বাংলাদেশে তাদের ডিজিটাল যাচাই কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এবং ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করার পথ খুঁজবে, যা উইকিপিডিয়ার কার্যক্রমের অনুরূপ।

প্রায় ৩০ মিনিটের এই বৈঠকে নিক ক্লেগ মেটার পক্ষ থেকে সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদানের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এ বিষয়ে বিপুল অভিজ্ঞতা রয়েছে।’

মেটার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, সম্প্রতি চালু হওয়া কোম্পানির ওপেন সোর্সড লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এআই, এলআইএএমএ স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন এটি বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের মধ্যে জনপ্রিয় হবে।

অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশে এলআইএএমএর ওপর এক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন সুযোগের দ্বার উন্মোচন করবে।’

বৈঠকে মেটার পলিসি প্ল্যানিং ডিরেক্টর প্রবীর মেহতা, বাংলাদেশ সরকারের এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি তারেক আরিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত