নাম বিকৃত করা নিকৃষ্ট স্বভাব

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৪৩ এএম

নাম, দুই অক্ষরের ছোট একটি শব্দ। তবে তাতে লুকিয়ে থাকে মানুষের পরিচয়ের ছাপ। প্রতিটি মানুষেরই একটি নির্দিষ্ট নাম থাকে। যা জন্মের পর পারিবারিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। এ নামটিই তার প্রথম পরিচয়। যা তার পুরো পরিচয় বহন করে। ব্যক্তির কাছে নিজের নামের গুরুত্ব অনেক। অন্যের কাছে অসুন্দর মনে হলেও এই নামটি তার কাছে সুন্দর।

প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো মানুষকে তার প্রকৃত নামে ডাকা। নাম বিকৃত ও ব্যঙ্গাত্মক করে কাউকে ডাকা অথবা প্রকৃত নাম বাদ দিয়ে অন্য নামে ডাকা ইসলামে স্বীকৃত নয়। এটি একটি গর্হিত কাজ। মন্দ লোকদের স্বভাব।

মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘হে ইমানদাররা! কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে। কেননা যাদের উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য নারীদের উপহাস না করে। কেননা যাদের উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না। ইমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো জালেম।’ (সুরা হুজুরাত ১১)

এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সঙ্গে উপহাস বা ঠাট্টা-বিদ্রুপ তখনই করে, যখন সে নিজেকে তার চেয়ে উত্তম এবং তাকে নিজের চেয়ে হীন ও ছোট মনে করে। অথচ আল্লাহর কাছে ইমান ও আমলের দিক দিয়ে কে উত্তম, আর কে উত্তম নয়, সেই জ্ঞান কেবল তারই কাছে। কাজেই নিজেকে উৎকৃষ্ট এবং অপরকে নিকৃষ্ট মনে করার কোনো বৈধতা নেই। তাই উক্ত আয়াতে অপরকে উপহাস করা হতে নিষেধ করা হয়েছে। আর চারিত্রিক এ রোগ নারীদের মধ্যে অধিকহারে বিদ্যমান থাকায় তাদের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করে বিশেষভাবে তাদের এ কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।

একজন মানুষের কাছে তার নামটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার নামটি হীরার চেয়েও দামি। অন্যের কাছে যতই খারাপ লাগুক না কেন। কেননা একজনের কাছে অপরের সবকিছু ভালো লাগা জরুরি না। তাই বলে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ বা ট্রল করা যাবে না। এটি একটি মারাত্মক গুনাহ। যা গিবত থেকে কোনো অংশে কম হবে না। একটা সময় ছিল, এই নাম বিকৃত করা সহপাঠী ও বন্ধুমহলের পরস্পর আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের কাছে সহজলভ্য হওয়ার কারণে সহজেই তা অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। আর এই দিক থেকে গুনাহের ভারটাও একটু বেশি হচ্ছে। যার হাত, মুখ ও জিহ্বা হতে তার অপর ভাই নিরাপদ নয়, সে প্রকৃত মুসলিম না। এ ব্যাপারে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ওই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ। আর যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে, সেই প্রকৃত হিজরতকারী। (সহিহ বুখারি)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপহাসকারীদের সম্পর্কে আরও বলেছেন, একজন উপহাসকারীর জন্য বেহেশতের দরজা খুলে দেওয়া হবে এবং তাকে বলা হবে, ‘এসো’। সে তার দুঃখ ও অসহায়ত্ব নিয়ে সামনে অগ্রসর হবে এবং যখন সে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইবে, তখনই তার সামনে বেহেশতের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। (কানজুল উম্মাল)

অন্যকে ছোট মনে করা বা উপহাস করা ইসলামে সরাসরি নিষিদ্ধ। অন্যের কষ্টের কারণ হয়, এমন যেকোনো কথা ও কাজ থেকে বেঁচে থাকার জোর তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম এভাবে মানুষের নাম নিয়ে উপহাস বা ব্যঙ্গ করাকে মারাত্মক গুনাহ ও গর্হিত কাজ বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু এ নাম নিয়ে বর্তমান সমাজে প্রায়ই উপহাস বা ট্রল করতে দেখা যায়। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বন্ধু মহলে একে অন্যকে নাম বিকৃত করে ডাকতে শোনা যায়। নাম বিকৃত করার এই প্রবণতা দিন দিন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা মন্দ লোকের কাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কোনো ব্যক্তির মন্দ প্রমাণিত হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে। (ইবনে মাজাহ) অপর হাদিসে এসেছে, তোমাদের কোনো ভাই যাতে অন্য মুসলিম ভাইকে ছোট না করে অর্থাৎ তার মান-সম্মান ক্ষুণœ না করে। কেননা প্রত্যেক মুসলিমের প্রতি অন্য ভাইয়ের রক্ত, মাল ও সম্মানকে ক্ষুন্ন করা হারাম করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম)

তাই আমাদের উচিত, এসব মন্দ অভ্যাস ত্যাগ করা। কাউকে নাম বিকৃত করে না ডাকা। অতীতে না জেনে এসবে লিপ্ত হয়ে থাকলে মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করা, যাতে পরকালে এর জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়। সঙ্গে সঙ্গে অপর ভাইকে তুচ্ছ মনে না করা। মহান আল্লাহ আমাদের এসব খারাপ অভ্যাস পরিহার করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত