মুনাফার ফাঁদে জমি-স্বাস্থ্যের ক্ষতি

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:০৬ এএম

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট আগে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, আলুসহ নানা ধরনের অর্থকরী ফসলের জন্য পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে তামাক চাষে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে জেলটি। দিন দিন এখানে তামাক চাষ বাড়ছেই। মুনাফার ফাঁদে পড়ে কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করলেও তা বুঝতে পারছেন না কৃষকরা।  

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এই জেলায় তামাক চাষের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়েছে। ফলে কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে এ চাষাবাদ।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিক মুনাফার আশায় অনেকেই অন্যান্য ফসল বাদ দিয়ে তামাক চাষে মনোযোগী হচ্ছেন। তামাক কোম্পানিগুলো চাষিদের বীজ, সার এবং বিনাসুদে ঋণ প্রদান করে চাষে উৎসাহ দিচ্ছে। এছাড়া তামাক উৎপাদনের আগে থেকেই কোম্পানিগুলো বাজার নিশ্চিত করায় কৃষকদের আর্থিক ঝুঁকি কম থাকে। ধান, গম কিংবা সবজি চাষে যে মুনাফা হয়, তামাকে তার চেয়ে বেশি লাভ হয়।

আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ধান, গম চাষ করে ন্যায্য দাম পাই না। কিন্তু তামাক চাষে কোম্পানি সব ব্যবস্থা করে দেয়। তাই আমরা তামাক চাষ করছি।’

জেলার ৫টি উপজেলার মধ্যে আদিতমারী, কালীগঞ্জ উপজেলাসহ তিস্তার চরাঞ্চল তামাক চাষে এগিয়ে রয়েছে। যেখানে আগে ধান-গম বা সবজির আবাদ হতো, সেসব জমি এখন তামাক চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে জেলায় তামাক চাষ হয়েছিল ৯ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে। তবে তামাক কোম্পানিগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এর পরিমাণ ৩০ হাজার হেক্টরের মতো।

কালীগঞ্জের চন্দ্রপুর এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পরিশ্রম হলেও তামাক চাষ করা লাভজনক। তামাক চাষ করে সেই জমিতে আবার ধানও হয়। সে কারণে আমাদের এলাকায় তামাক চাষ অনেক বেশি হয়েছে।’ একই গ্রামের কৃষক হোসেন আলী বলেন, ‘তামাক চাষে কোনো ঝুঁকি নেই। আবাদ করতে পারলেই টাকা।’

তবে লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু রায় বলেন, ‘তামাকজাত দ্রব্য যেমন বিড়ি, সিগারেট, গুল ব্যবহারে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, স্ট্রোক এবং ক্যানসারের মতো জটিল রোগ বাড়ছে। তামাক চাষের সময় ব্যবহৃত রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং আশপাশের পানীয় জল দূষিত করে। তামাক চাষ ও এর ব্যবহার উভয়ই জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘তামাক চাষে জমির পুষ্টি উপাদান শোষিত হয়। এতে ভবিষ্যতে এ জমি কৃষিকাজের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। তাই তামাক চাষ কমানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে উঠান বৈঠক, সেমিনার এবং প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। তবে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলোভনের কারণে এটি খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না।’

লালমনিরহাট জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানা বলেন, ‘তামাক চাষের পরিবর্তে কৃষকদের জন্য বিকল্প ফসলের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরিষা, ভুট্টা বা ডাল জাতীয় ফসল চাষে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। পাশাপাশি তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে সরকারের আরও কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়া তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে এ চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমানো সম্ভব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত