হাপিস হয়ে যাচ্ছে বেবিচকের ১৩০৯ কোটি টাকা!

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:০০ পিএম

একসময় আকাশপথে দেদার ব্যবসা করেছে ইউনাইটেড, রিজেন্ট ও জিএমজি এয়ারলাইনস। তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। আর্থিকভাবে লাভবানও হয়েছিল সংস্থাগুলো। তারপরও উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা পরিশোধ করতে টালবাহানা করছে তারা। এ নিয়ে দিনের পর দিন বৈঠক করেছে মালিকপক্ষ ও বেবিচক। একপর্যায়ে লোকসান দেখিয়ে তিনটি এয়ারলাইনসই চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে পরিত্যক্তের ঘোষণা দেয় বেবিচক। এখন পর্যন্ত বেবিচক তাদের কাছে পায় ১৩০৯ কোটি টাকা। টাকা উদ্ধার করতে নানা মহলে তদবির করে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রের এ সংস্থাটি। এ তিনটি এয়ারলাইনস ছাড়াও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ অন্য এয়ারলাইনসগুলোর কাছেও বেবিচকের পাওনা রয়েছে। সব মিলিয়ে সংস্থাটির পাওনা ৭ হাজার ৭২২ কোটি টাকা।

অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতসহ অন্যান্য দেশে সারচার্জের হার বার্ষিক ৮ থেকে ১০ শতাংশের বেশি নয়। আমরা ক্রমাগত যুক্তিসংগত সারচার্জ হার নির্ধারণের দাবি করে আসছি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে কালক্ষেপণ করছে।

এসব কারণে আমরা নিয়মিত পাওনা টাকা দিতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। তারপরও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমানে চারটি বিমান সংস্থা কাজ করছে বাংলাদেশে। এগুলো হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা ও এয়ার অ্যাস্ট্রা এয়ারলাইনস। রিজেন্ট, ইউনাইটেড ও জিএমজি এয়ারলাইনস তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এয়ারলাইনসগুলোর কাছে এত বিপুল পাওনা নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বকেয়া আদায় করতে না পারায় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। এ নিয়ে সম্প্রতি বেবিচক কার্যালয়ে বিশেষ বৈঠক হয়। বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জই শুধু সংস্থাটির আয়ের ভরসা। নতুন করে যাত্রী নিরাপত্তা ফি ও বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করলেও তা মোট ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য। দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা রয়েছে। মাঝেমধ্যে এয়ারলাইনসগুলো নিয়মিত পাওনা পরিশোধের চেষ্টা করছে। বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে রিজেন্ট, জিএমজি ও ইউনাইটেডের কাছে। সুদাসলে এ পর্যন্ত বেবিচক পাবে ১৩০৯ কোটি টাকা। রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে বেবিচক মনে করছে। তারা এ অর্থ খেয়ে ফেলার পাঁয়তারা করছে। রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে ৪০৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের কাছে ৩৮৮ কোটি এবং জিএমজির কাছে ৩৯৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা পাবে বেবিচক। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বকেয়া ৬ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা, নভোএয়ারের কাছে পাবে ২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা। তবে এয়ার অ্যাস্ট্রার কাছে বেবিচকের কোনো পাওনা নেই। ইউএস-বাংলার হিসাবের তথ্য মেলেনি।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বছরের পর বছর ধরে পাওনা আটকে রাখা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে পরিচালিত দেশি-বিদেশি অন্যসব এয়ারলাইনসকে নিয়মিত পাওনা দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। অর্থ পরিশোধের জন্য বেবিচক নিয়মিত চিঠিই দিয়ে যাচ্ছে শুধু। কিন্তু পরিশোধের নিশ্চয়তা মিলছে না। যদি কোনো বিমান সংস্থা সময়মতো বেবিচককে পাওনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের প্রতিবছর অতিরিক্ত ৭২ শতাংশ সারচার্জ দিতে হবে। অনেক বিমান সংস্থা সারচার্জের কারণে তাদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না, বিশাল ঋণের কারণে অনেকে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘শাহজালাল বিমানবন্দরের মোট বকেয়ার পরিমাণ ২ হাজার ৬৩২ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, শাহ আমানত বিমানবন্দরে ৫২৩ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৮৮ কোটি ৭২ লাখ ৫৯ হাজার, যশোর বিমানবন্দরে ১৯ লাখ ৮৭ হাজার, বরিশাল বিমানবন্দরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার, কক্সবাজার বিমানবন্দরে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৪১ হাজার, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ও রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের পাওনা ১৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।’ হিসাবটি আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে বলে তিনি জানিয়ে বলেন, ‘পরিত্যক্ত এয়ারলাইনসের অর্থ পাওয়া যাবে না বলেই আমরা ধরে নিয়েছি। তারপরও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।’

বেবিচক সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে বেবিচকের পাওনা ৬ হাজার ৩২৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। গত ১৮ ডিসেম্বর বেবিচকে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় বকেয়া আদায়ে নিয়মিতভাবে বিমান সংস্থাগুলোকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে ১৯টি নন-অ্যারোনটিক্যাল চুক্তি স্বাক্ষরেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না করেই বেবিচকের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিচ্ছে। বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো বকেয়া পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ১২টি এয়ারক্রাফট বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পরিত্যক্ত এয়ারলাইনসের মধ্যে আটটি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের, দুটি রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ও একটি জিএমজি এয়ারলাইনসের। গত ২৫ মে বেবিচক নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরিত্যক্ত এসব উড়োজাহাজ সরিয়ে নিতে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হলেও সংস্থাগুলো সাড়া দিচ্ছে না। উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৪টি এমডি ৮৩, ১টি এ-৩১০৩২৫, ১টি এটিআর ৭২২০২, ১টি এটিআর ৭২১২, একটি ড্যাশ-৮, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ২টি ড্যাশ-৮, অ্যাঞ্জেল এয়ারওয়েজ লিমিটেডের একটি এএন২, জিএমজি এয়ারওয়েজের ১টি এমডি-৮২ মডেলের এয়ারক্রাফট।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গোর অ্যাপ্রোচে দীর্ঘদিন ধরে ১২টি উড়োজাহাজ ও আনুষঙ্গিক মালামাল অব্যবহৃত, পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। উড়োজাহাজগুলো অপসারণ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে একাধিকবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে রপ্তানি কার্গো এলাকায় নিয়মিত বা অনিয়মিত ফ্লাইটের পার্কিং, উড়োজাহাজে মালামাল বোঝাই ও যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি পার্কিংয়ের জায়গার সংকুলান না হওয়ার কারণে নতুন বা অনিয়মিত কার্গো ফ্লাইটের অনুমোদন, বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমসহ সার্বিক অ্যাভিয়েশন কর্মকাণ্ড ও দেশের রপ্তানি উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তা ছাড়া উড়োজাহাজগুলোর কারণে বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত