যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফিরেই নির্বাহী আদেশ জারির ঝড় বইয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পূর্ববর্তী বাইডেন প্রশাসনের অনেক পরিকল্পনা থেকেও সরে এসেছেন। ট্রাম্পের জারি করা এসব নির্বাহী আদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমালোচনার মুখে পড়েছে। যার মধ্যে অন্যতম বৈদেশিক সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিতাদেশ। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বিদেশে প্রায় সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাতে বিভিন্ন বৈশ্বিক কর্মসূচির কোটি কোটি ডলারের তহবিল পড়েছে হুমকির মুখে। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান বৈদেশিক সহায়তাগুলো পর্যালোচনা করার পর সেগুলো চালিয়ে নেওয়া বা একেবারে স্থগিতের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনা ছাড়া অন্ধভাবে কোনো ধরনের অর্থ সহায়তা না দিতে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে সহায়তা বন্ধের এই ঘোষণা বিভিন্ন দেশ ও কর্মসূচিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে সেই চিত্র তুলে ধরেছে।
বিশ্বে একক দেশ হিসেবে সব থেকে বড় দাতাদেশ যুক্তরাষ্ট্র। আলজাজিরা জানিয়েছে, ২০২৩ সালে ওয়াশিংটন ৭ হাজার ২০০ কোটি (৭২ বিলিয়ন) ডলার বৈদেশিক সহায়তা দিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্ত সহায়তাপ্রাপ্ত দেশ ও বিভিন্ন সংস্থার জন্য জন্য বড় ধাক্কা। এসব অর্থ ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টসহ (ইউএসএআইডি) বিভিন্ন বৈশ্বিক কর্মসূচি থেকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএআইডির মাধ্যমে ৪ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ও ট্রেজারি বিভাগ দিয়েছে ২১৭ কোটি ডলার।
খাত হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিংহভাগ সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সে বছর ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বরাদ্দ দিয়েছে দেশটি। স্বাস্থ্যসেবায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। আর মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৮২০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে বিভিন্ন দেশকে, যার অর্ধেকই পেয়েছে ইসরায়েল ও মিসর। কোন দেশকে কতটুকু সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র : ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ইউক্রেন। সে বছর ইউক্রেনকে ১ হাজার ৬৬২ কোটি ডলার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সহায়তা ১ হাজার ৬৪৮ কোটি ডলার ও সামরিক সহায়তা ১৪ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন চালানো ইসরায়েল। দেশটি ৩৩১ কোটি ডলার সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি অর্থনৈতিক সহায়তা বাদে পুরোটাই সামরিক সহায়তা। তৃতীয় স্থানে থাকা ইথিওপিয়া ১৭৭ কোটি ডলার অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। জর্ডান ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ১৭২ কোটি ডলার পেয়েছে। এর মধ্যে ১২৯ কোটি ডলার অর্থনৈতিক সহায়তা ও ৪৩ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা। পঞ্চম অবস্থানে থাকা মিসর পেয়েছে ১৪৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সহায়তা ২২ কোটি ডলার ও সামরিক সহায়তা পেয়েছে ১২২ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্র ওই বছর আফগানিস্তানকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে ১২৭ কোটি ডলার। সোমালিয়াকে অর্থনৈতিক সহায়তা হিসেবে ১০৮ কোটি ডলার ও সামরিক সহায়তা হিসেবে ১৩ কোটি ডলার। ইয়েমেন অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছে ৮৩ কোটি ডলার। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সহায়তার তালিকার ২০ নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। ওই বছর দেশটি বাংলাদেশকে দিয়েছে ৫৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৫১ কোটি ডলার অর্থনৈতিক সহায়তা আর ৪ কোটি ডলার দিয়েছে সামরিক সহায়তা হিসেবে।
ইসরায়েল ও মিসরের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি : আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলকে প্রতিবছর ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। তবে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির যুদ্ধ-সংক্রান্ত ব্যয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলকে অতিরিক্ত আরও ১ হাজার ৭৮৯ কোটি ডলার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটিকে ১২ হাজার কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। সামরিক সহায়তা পাওয়ার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিসর। ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মিসরকে ১২০ কোটি সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ওই চুক্তির পর থেকে মিসর অর্থনৈতিক সহায়তাও পেয়ে আসছে।
যে কর্মসূচিতে প্রভাব বেশি পড়বে : ট্রাম্পের সহায়তা বন্ধের ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ার ঝুঁকিতে আছে প্রেসিডেন্টস ইমারজেন্সি প্ল্যান ফর এইডস রিলিফ (পিইপিএফএআর) কর্মসূচি। এর আওতায় অন্তত ৫০টি দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ শিশু। ২০০৩ সালে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে বিশ্বের সব থেকে বড় এই স্বাস্থ্য কর্মসূচি গৃহীত হয়। কর্মসূচিটি চালুর পর থেকে এটি ১২ হাজার কোটি ডলার পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছ থেকে। ঘানা, মোজাম্বিক ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এইচআইভি ও যক্ষ্মা নিয়ে কাজ করা অলাভজনক অরাম ইনস্টিটিউট কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। সহায়তা বন্ধের ধাক্কা পড়েছে বাংলাদেশেও। তবে রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে বলে তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন পরিচালিত প্রকল্পে কাজ করা সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ক্রমান্বয়ে ছাঁটাই করার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)।
প্রতিক্রিয়া : বিদেশি সহায়তা কার্যক্রম স্থগিত করে জাতিসংঘ আর মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের ঘোষণার ফলে বিভিন্ন সংস্থাকে নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে। কেউ কেউ উদ্ভূত এই পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। কেউবা আবার দ্রুত খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্দি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ব্যয়সংকোচন হিসেবে সতর্ক করেছেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশ্বের অন্তত ১০০টি দেশের প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ২ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন (২৪৯ কোটি) ডলারের তহবিল পেয়েছে। ট্রাম্পের নির্দেশ বিশ্ব জুড়ে অনেক পরিবারের জন্য জীবন-মৃত্যুর পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে শঙ্কা জানিয়েছে অক্সফাম। বিশ্ব জুড়ে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তবে পর্যালোচনা শেষে অধিকাংশ কর্মসূচি আবারও চালু, কিংবা ব্যাপকভাবে পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো র্যাচেল বোনিফিল্ড।
