দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হত্যাসহ গুরুতর বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটছে। তালিকাভুক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা কারাগার থেকে বের হয়ে আসছে। তারা জড়াচ্ছে নতুন নতুন অপরাধে। এমন পরিস্থিতিতে জামিনে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরার ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ। তবে এতেও অপরাধ কমছে না। পুলিশ সদর দপ্তর অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি অপরাধে কলকাঠি নাড়ছে ভাসমান অপরাধীরাও। এরই মধ্যে নতুন করে একটি তালিকা করা হয়েছে। যাতে ৭০ হাজার ভাসমান অপরাধী সক্রিয় আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ভাসমান অপরাধীদের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাও আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। নতুন তালিকায় নাম ওঠা ভাসমান অপরাধীদের স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও কোনো কোনো এলাকায় তারা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, সেই তথ্য মিলেছে। এই অপরাধীদের ধরতে শিগগিরই বড় পরিসরে বিশেষ অভিযান শুরু হবে বলে পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তি, জুরাইন বালুর মাঠ বস্তি, গোপীবাগের টিটিপাড়া বস্তি, মালিবাগের কুমিল্লা বস্তি, মোহাম্মদপুরের বালুর মাঠ বস্তি, মালিবাগের রেললাইন বস্তি, খিলগাঁওয়ের নোয়াখাইল্লা বস্তি, মীরহাজিরবাগ বস্তি, ধলপুর সিটিপল্লী বস্তি, নামাশ্যামপুর বস্তি, গে-ারিয়ার রেললাইন বস্তি, পার গেন্ডারিয়া বস্তি, মহাখালীর সাততলা বস্তি, পোস্তগোলা ডিআইটি বস্তি, ডেমরার চরপাড়া বস্তি এবং পূর্ব দোলাইরপাড় ডিপটি গলির বস্তিসহ রাজধানীর বেশিরভাগ বস্তিতেই রয়েছে ভাসমান অপরাধীদের আস্তানা। প্রকাশ্যেই তারা মাদক বেচাকেনা করে। রাজধানীর বাইরে জেলাগুলোতেও ভাসমান অপরাধীদের তৎপরতা রয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ এড়িয়ে হত্যাসহ প্রায় সব ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৩২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ডাকাতি হয়েছে ১ হাজার ৪১২টি। এ সময় মামলা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫টি। যার অধিকাংশে পেশাদার অপরাধীরা সম্পৃক্ত ছিল বলে পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভাসমান অপরাধীরা এক এলাকায় অপরাধ করে অন্য এলাকায় গিয়ে আস্তানা বানায়। সেখানে আবার অপরাধ করে আরেক এলাকায় পালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে তাদের ধরতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। এমন পরিস্থিতিতে কিশোর গ্যাংয়ের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, ভাসমানদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি এবং বিট পুলিশিং জোরদারের বিষয়টি উঠে আসে। যেসব এলাকায় ভাসমানদের আনাগোনা বেশি সেখানে নজরদারি বাড়ানোর তাগাদা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর উত্তরা, বিমানবন্দর, বিশ্বরোড, কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর রেলস্টেশন ও হাইকোর্ট এলাকাসহ দেড়শর বেশি স্থানকে ভাসমান অপরাধের জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইতিমধ্যে। খুন, ছিনতাই ও মাদক সেবনসহ প্রায় সব ধরনের অপরাধে জড়িত ভাসমান অপরাধীরা। এমনকি নিজেদের মধ্যেও খুনোখুনি করছে তারা। হত্যার পাশাপাশি চুরি-ডাকাতি-ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। তাদের অধিকাংশেরই স্থায়ী ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। যে কারণে এই অপরাধীদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভাসমান অপরাধীদের নিয়ে সম্প্রতি একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বলা হয়েছে, ভাসমান অপরাধীরা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশ সদর দপ্তর নির্দেশনা দেওয়ার পর জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশ অনুসন্ধান চালিয়ে তালিকা তৈরি করে। ওই তালিকায় অনুযায়ী ৭০ হাজারের মতো ভাসমান অপরাধী আছে। তার মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরে এমন অপরাধীর সংখ্যা বেশি। রিকশাচালক, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, দোকান কর্মচারী, ভাঙারি ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালা বা হালকা যানবাহনের চালকবেশে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যায় এসব অপরাধী। ফলে তাদের ধরতে বেগ পেতে হচ্ছে। সারা দেশে ৪৫ হাজারের মতো বস্তি আছে। তার মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ১১০টি। এসব বস্তিতেই ভাসমান অপরাধীরা বেশি সক্রিয়। এ ছাড়া বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও ফুটপাতেও থাকে তারা।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভাসমান এসব অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণ করে কথিত কিছু রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ভাসমান অপরাধীদের নিয়ে সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয় ভাসমান অপরাধীদের সংখ্যা জানতে মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং জেলার পুলিশ সুপার ও ইউনিটপ্রধানদের কাছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠি পেয়ে ইউনিটপ্রধানরা বৈঠক করেন। থানার ওসিদের অনুসন্ধান করে তালিকা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে কিশোর গ্যাংয়ের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, ভাসমান মানুষ নিয়ে নজরদারি বৃদ্ধি এবং বিট পুলিশিং জোরদার করার বিষয়টি উঠে আসে। ভাসমান লোকজনের আনাগোনা বেশি এমন এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর তাগাদা দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, বগুড়া, ফরিদপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল, ঢাকার সাভার, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের টঙ্গী ও কুষ্টিয়া এলাকায় ভাসমান অপরাধীর সংখ্যা বেশি। এসব অঞ্চলের বস্তিতেই বেশি বসবাস তাদের। অস্ত্র, মাদক কেনাবেচা, নারী ও শিশু পাচার, ছিনতাই এবং চুরি-ডাকাতির মতো গুরুতর সব অপরাধে জড়িত এই অপরাধীরা। রাজধানী ঢাকায় ভাসমান ও ছদ্মবেশী অপরাধীরা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য যেন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। স্থায়ী ঠিকানাবিহীন এসব অপরাধী কোনো জায়গায় অপরাধ করে নির্বিঘ্নে সটকে পড়ে। তাদের শনাক্ত করতে গিয়ে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হচ্ছে পুলিশকে। ছিনতাই, চাঁদাবাজির পাশাপাশি এই অপরাধীদের কেউ কেউ ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করে।
