অডিট শ্রীলঙ্কায় ঘুরে বেড়ান মালদ্বীপ

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:১১ এএম

অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সোহেল আহমেদ এবং প্রধান অর্থ ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম শ্রীলঙ্কার বাংলাদেশ হাইকমিশন অডিট করতে গিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন মালদ্বীপে। তারা নিজেদের দায়িত্ব ফেলে গত ২ ডিসেম্বর মালদ্বীপ যান। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো ফেরেন চার দিন পর অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর। অথচ বিদেশে বাংলাদেশি মিশন অডিটের ক্ষেত্রে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অডিটরদের ছুটির দিনেও কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সোহেল আহমেদ এবং আবুল কালামের জন্যও একই ধরনের নির্দেশনা ছিল। তাদের ভ্রমণ-সংক্রান্ত অফিস আদেশে বলা হয় ২৩, ২৪, ও ৩০ নভেম্বর এবং ১ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যে পড়বে। ছুটি বা অন্য কোনো কারণে কর্মদিবসের সংখ্যা কমে গেলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অডিট শেষ করতে হবে। ফিটস এয়ারের ৮ডি৮১১ ফ্লাইটে ২ ডিসেম্বর কলম্বো থেকে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে পৌঁছান এই দুই অডিটর। ৫ ডিসেম্বর একই এয়ারলাইনসের ৮ডি৮১৪ ফ্লাইটে মালে থেকে কলম্বো আসেন তারা। তাদের টিকিট ই-বুকিং করা হয় ৩০ নভেম্বর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে বাংলাদেশি মিশন অডিট খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। তাদের যাতায়াত ছাড়াও মর্যাদা অনুযায়ী হোটেল ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। এমনকি অডিটরদের ঘুমানোর সময়টাও পেমেন্টের আওতায় আনতে হয়। এ ছাড়া তাদের টার্মিনাল ফি দেওয়া হয় (কোনো টার্মিনালে অবস্থানের সময় মালপত্র বহনের ক্ষেত্রে সহায়তা নেওয়া হলে বা অপেক্ষমাণ সময়ে কিছু খেতে হলে সে টাকা) দৈনিক ভাতার ২৫ শতাংশ। এসব কারণে অডিটরদের স্থানীয়ভাবে সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতেও কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সরকারি আদেশ অমান্য করে দুই অডিটরের এই স্বেচ্ছাচারী ভ্রমণের বিষয়ে জানতে চাইলে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপমহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (প্রশাসন) শাহজাহান সিরাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জার্মানি ও কলম্বো অডিট ট্যুরের বিষয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। প্রতিটি দিন ও প্রতিটি বিষয় যাচাই করবে তদন্ত কমিটি। দুই কর্মকর্তার পাসপোর্ট খতিয়ে দেখা হবে। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। দোষী প্রমাণিত হলে সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিজেদের দায়িত্ব ফেলে মালদ্বীপ ভ্রমণের বিষয়ে জানতে চাইলে সোহেল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অডিটে নানা অনিয়ম পাওয়া যায়, এসব কারণে সংক্ষুব্ধ গ্রুপ নানা অপবাদ ছড়ায়।’ তবে এই অডিটর মালদ্বীপ ভ্রমণের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান।

আরেক অডিটর আবুল কালামের কাছে মালদ্বীপ ভ্রমণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অডিট ট্যুরের সব ব্যাখ্যা টিম লিডার সোহেল আহমেদ দেবে।’

এর আগে এই দুই অডিটর জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাস অডিট করতে যান। সেখানে তারা নানা অনিয়ম করেন। তাদের প্রথমে ২১ দিনের জন্য বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস অডিট করতে পাঠানো হয়। ৩১ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর তাদের থাকার কথা ছিল বার্লিন দূতাবাসে। আর ১৯ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর অডিট করার কথা ছিল শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় বাংলাদেশ দূতাবাসে। কিন্তু তারা বার্লিন থেকে কলম্বো ফেরেন ২১ নভেম্বর। আবার অডিট অর্ডারে বলা হয়েছিল, বিদেশে অডিটের কাজে অবস্থানকালে ছুটির দিন পরলেও সেসব দিনে কাজ করতে হবে। কিন্তু শুরুতেই দুই অডিটর দুদিন বেশি অবস্থান করেন জার্মানিতে। আবার কলম্বোয় এসে চার দিনের জন্য তারা চলে যান মালদ্বীপে। একদেশে কাজে অবস্থান করে তারা ভিন্ন ভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ান। জার্মানি সফরে এই দুই অডিটর মাত্র পাঁচ দিন কাজ করেন। সেখানে দূতাবাসের সরকারি গাড়ি নিয়ে ইউরোপ দর্শনে বেড়িয়ে পড়েন। সরকারি গাড়ির তেল পুড়িয়ে তারা যান সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক, গ্রিস, আলবেনিয়া ও মেসিডোনিয়ায়। জার্মানির প্রদেশে প্রদেশেও ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ সময় ৪ হাজার ৮৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। জার্মানিতে স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের ঘটনা ঘটনায় ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে অডিট কর্র্তৃপক্ষ।

জার্মানিতে সরকারি গাড়ির জ্বালানি পুড়িয়ে দূতাবাসের স্টাফ নিয়ে দেশে দেশেই শুধু ঘুরে বেড়াননি এই অডিটর। তারা মিশনের কর্মকর্তাদের কাছে উপহার চেয়েছেন। লাঞ্চ বা ডিনার করাতে বাধ্য করেছেন। ফিরে আসার টিকিটও আদায় করেছেন। নিয়ম হলো অডিট রিপোর্টে আপত্তি উল্লেখ করে তাতে মিশনপ্রধানের স্বাক্ষর নিয়ে আসার। কিন্তু তারা আপত্তি উল্লেখ না করেই একটি তালিকা ও ফরোয়ার্ডিং চিঠি বানিয়ে দূতাবাসপ্রধানকে দিয়ে ‘সিন অ্যান্ড ডিসকাসড’ লিখিয়ে এনেছেন। ঢাকায় এসে আপত্তি জানানোর কথা বলে এসেছেন। এসব অনিয়মের বিষয় তুলে ধরে দূতাবাসের কর্মকর্তারা সিএজির (মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত