চোখে আঘাতের এত রোগী দেখে বিস্মিত সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৫ এএম

দেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন প্রধান উপদেষ্টার আমাদের ওপর নির্দেশ ছিল আহতদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দেওয়া। সেটা আমরা পালন করার চেষ্টা করেছি এবং করে যাচ্ছি।’

গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বিকেল ৫টায় এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এ কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চোখে আঘাতপ্রাপ্তদের উন্নত চিকিৎসা দিতে সিঙ্গাপুর থেকে আসা চিকিৎসক দলের পর্যবেক্ষণ জানতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। দুদিনের চিকিৎসা শেষে গতকাল রাতেই দেশত্যাগ করেছে এই চিকিৎসক দল। সংবাদ সম্মেলনে তারা জানিয়েছেন, তারা তাদের কর্মজীবনে একসঙ্গে চোখে আঘাতপ্রাপ্ত এত রোগী দেখেননি। এটি তাদের জন্য খুবই দুঃখজনক একটি ঘটনা।

৩০ জন আহতকে ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছে সরকার : সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘এরই মধ্যে পাঁচ দেশ থেকে চিকিৎসকরা এসেছেন আহতদের চিকিৎসা দিতে। সরকারের চেষ্টা ছিল যে ছেলেগুলো হাত, পা ও চোখ হারিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়া। যে সময় আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন টাঁকশালে কোনো ডলার ছিল না। ছিল লোনের বোঝা। কিন্তু আমরা কখনোই আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে কার্পণ্য করিনি। আমরা ইতিমধ্যে ৩০ জন আহতকে ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছি।’

আহতদের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ অবস্থা বর্ণনা করে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘৩০ জনের ভেতর মুসা নামের আহতের জন্য আমাদের ইতিমধ্যে ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আর কবে নাগাদ তার রিকভারি হবে, সেটা আমরা জানি না। তবে মার্চে তার আরেকটা অপারেশন হবে। হাসান নামের একজনের ব্রেইন ইনজুরি ছিল। তার জন্য ইতিমধ্যে খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৩৬ লাখের বেশি। সে এখনো কোমায় আছে। কবে নাগাদ সুস্থ হবে, তাও বলা যাচ্ছে না। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

স্বাধীনতার এত বছর পরও বাংলাদেশে এখনো একটা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নেই বলে জানান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমাদের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আনতে হয়েছে ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুর থেকে। কখনো কখনো ব্যাংকক থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আনতে হয়েছে। প্রতিবার ৬০ লাখ টাকার মতো ব্যয় হয়েছে। কিন্তু আমরা কখনো অর্থের কথা চিন্তা করিনি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, যেভাবে হোক আমাদের সন্তানগুলোকে সুস্থ করে তোলা।’

একসঙ্গে এত বেশি রোগী আগে দেখেননি সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা : সংবাদ সম্মেলনে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডোনাল্ড ইউ বলেন, ‘আমরা ২৭৮ জনের মতো আহত রোগী দেখেছি এবং বলতে হচ্ছে আমার চিকিৎসা জীবনের সবচেয়ে অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এত বেশি চোখের ইনজুরি আমরা আমাদের চিকিৎসা জীবনেও কোনো দিন দেখিনি। এটি আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক ব্যাপার।’

রোগীদের বর্ণনা দিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, ‘কিছু কিছু রোগীর বয়স ৯ থেকে ১০ বছর। অনেকে চোখে বন্দুকের প্যালেটের কারণে মারাত্মকভাবে আঘাত পেয়েছেন। এ ছাড়া আহত রোগীদের ক্রিটিক্যাল ফেইজে বাংলাদেশের চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিয়েছেন, সেটা মিরাকল বলব। অনেক ক্ষেত্রেই যারা চোখে আঘাত পেয়েছেন, তারা সাহায্যের বাইরে। কিন্তু কিছু রোগী আমরা শনাক্ত করেছি, যাদের সিঙ্গাপুরে নিয়ে গেলে উন্নতি করা সম্ভব। আমরা সাত, আটজন রোগীকে শনাক্ত করেছি, তাদের চিকিৎসা সিঙ্গাপুরে হলে তাদের চোখের অবস্থার আরও উন্নতি করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু কিছু আহত আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে, যেটা আমার জন্য সত্যিই হৃদয়বিদারক। আমি বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করব, যাতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ সাইকোলজিক্যাল চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে অনেকেরই এ বাস্তবতাটা মেনে নিতে হবে যে কেউ কেউ এক বা দুই চোখ সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে।’

আন্তরিকতার ঘাটতি নেই : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আহত যোদ্ধাদের সুচিকিৎসা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। আহত যোদ্ধাদের কষ্টের কথা যেভাবে সিঙ্গাপুরের ডাক্তার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাক্তার অনুভব করেছেন, আমরা স্বাধীন ও মুক্তদেশের নাগরিক হিসেবে আহত যোদ্ধাদের প্রতি আরও অনেক বেশি ঋণগ্রস্ত, অনেক বেশি কৃতজ্ঞ। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব মনে করে আমরা যথাসাধ্য সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। এ ছাড়া আহত যোদ্ধাদের যেসব বিষয় নিয়ে মনোবেদনা এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়গুলোয় আমরা মনোযোগ দিয়েছি এবং দিচ্ছি।’

অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান আরও বলেন, ‘আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং করছি। বিদেশে গমন এবং উচ্চতর চিকিৎসার ব্যাপারে যেসব আবেদন থাকবে, সেগুলো আমাদের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেব। সিঙ্গাপুরের ডাক্তার ইতিমধ্যে তারা সাত আটজনকে সিঙ্গাপুরে রিকমেন্ড করেছেন চিকিৎসা নেওয়ার ব্যাপারে। ওনাদের সুপারিশের আলোকে তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেব।’

আহতদের ফিজিওথেরাপির ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আহত যোদ্ধাদের ফিজিওথেরাপির ক্যাপাসিটি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। চায়না থেকে রোবোটিক ফিজিওথেরাপির যন্ত্রপাতি আনছি। তবে আশা করছি, বেশি মানুষের প্রয়োজন হবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত