গিবত আরবি শব্দ। এর অর্থ পরনিন্দা করা, কুৎসা রটানো, বদনাম করা, পেছনে সমালোচনা করা ইত্যাদি। পরিভাষায় গিবত বলা হয়, কোনো মুসলমানের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কোনো দোষের কথা বলা, যা শুনলে সে মনে কষ্ট পায় এবং সে তা অপছন্দ করে। গিবত শুধু মুখের ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাচনিক ভঙ্গি কিংবা লেখনীর মাধ্যমে অথবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়েও হতে পারে। গিবত সামাজিক শান্তি বিনষ্টকারী একটি ঘৃণ্য অপরাধ। অথচ এমন অভ্যাস বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গিবত খুবই জঘন্য ও নিন্দনীয় কাজ এবং এটি কবিরা গুনাহ। তাই এটা থেকে বিরত থাকা আদর্শ মানুষের কর্তব্য। গিবতের ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
নেক আমল নষ্ট হয় : গিবতের কারণে মানুষের নেক আমল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন কোনো ব্যক্তি তার আমলনামায় কোনো কোনো নেক আমল লিপিবদ্ধ না দেখে জিজ্ঞেস করবে, ‘হে আল্লাহ! আমি তো দুনিয়ার জীবনে এই এই নেক কাজ করেছি, অথচ তা আমার আমলনামায় দেখতে পাচ্ছি না।’ তখন মহান আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি অমুক অমুক লোকের গিবত করেছ। তাই তোমার আমলনামা থেকে তা বিয়োগ করে তুমি যার গিবত করেছ তার আমলনামায় যোগ করে দিয়েছি।’ (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব) হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘বান্দার নেক আমল গিবতের দ্বারা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। আগুন যেভাবে কাঠ পুড়িয়ে দেয় তার চেয়েও দ্রুতগতিতে গিবত নেক আমল নিঃশেষ করে দেয়।’ (ইহয়াউল উলুম)
কেউ হাসান বসরি (রহ.)-এর গিবত করলে তিনি অত্যন্ত খুশি হতেন এবং তার নিকট প্লেটভর্তি ফলমূল ও মিষ্টি পাঠাতেন। তিনি বলতেন, সে কষ্ট করে নেকি কামাই করে আমাকে দিয়ে দিয়েছে এবং আমার গুনাহ সে নিয়েছে। এর চেয়ে বড় উপকার আর কী হতে পারে? এ জন্য আমি তাকে ফলমূল ও মিষ্টি হাদিয়া পাঠিয়েছি।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কখনো গিবত করতেন না। তিনি বলতেন, যদি গিবত করতেই হয়, তাহলে তুমি তোমার পিতা-মাতার গিবত করো! কারণ, এতে তোমার নেকি অন্যের আমলনামায় না গিয়ে তোমার পিতা-মাতার আমলনামায় যাবে এবং তারা উপকৃত হবে।
কবরের শাস্তি : গিবতের কারণে গিবতকারীকে কবরে শাস্তি দেওয়া হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘এই দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে তাদের তেমন কোনো বড় অপরাধের কারণে এ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। এদের একজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে গিবত করার কারণে এবং অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে প্রস্রাব করার পর উত্তমরূপে পবিত্র না হওয়ার কারণে।’ (সহিহ বুখারি) এ হাদিসে বোঝানো হয়েছে যে, এ দুটি অপরাধ ক্ষুদ্র এ হিসেবে যে, এ থেকে বেঁচে থাকা খুব কঠিন বিষয় ছিল না। কিন্তু এর শাস্তি অনেক বড়, যা কবরেই শুরু হয়ে গেছে।
জাহান্নামের শাস্তি : গিবতের মাধ্যমে মানুষের সম্মান নষ্ট হয়। তাই গিবতকারীকে পরকালে জাহান্নামে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা অগ্র-পশ্চাতে অন্যের দোষ বলে বেড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুঃসংবাদ।’ (সহিহ মুসলিম) পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে মানুষের নিন্দা করে।... অবশ্যই তারা হুতামাতে (জাহান্নামে) নিক্ষিপ্ত হবে। তুমি কি জানো হুতামা কী? তা আল্লাহর প্রজ¦লিত অগ্নি, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। নিশ্চয়ই তা তাদের বেষ্টন করে রাখবে, দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে।’(সুরা হুমাজাহ ১-৯)
যারা নিন্দুক তাদের আগুন চারদিক থেকে ঘিরে রাখবে, তাদের অগ্নিকু-ে নিক্ষেপের পর চিরদিনের জন্য সেটার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে তারা তা থেকে বের হতে পারবে না এবং জাহান্নামের উত্তাপ থেকেও বের হতে পারবে না। একপর্যায়ে লৌহ নির্মিত সিন্দুকের মধ্যে বন্ধ করে রাখা হবে। এরপর সেই সিন্দুককে বন্ধ করে জাহান্নামের নিম্নদেশে নিক্ষেপ করা হবে। আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন আমাকে মেরাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমি তামার নখবিশিষ্ট একদল লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তারা নখগুলো দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাইল! এরা কারা? জিবরাইল (আ.) বললেন, এরা হলো ওইসব লোক, যারা দুনিয়াতে মানুষের গোশত খেত এবং তাদের মানসম্মান নষ্ট করত। অর্থাৎ তারা মানুষের গিবত করত এবং তাদের ইজ্জত-সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলত।’ (আবু দাউদ)
জান্নাত থেকে বঞ্চিত : গিবতকারী যদি গিবত থেকে তওবা না করে মারা যায়, তবে সে প্রথম সুযোগে জান্নাতে যেতে পারবে না; বরং তাকে গিবতের শাস্তি পাওয়ার জন্য প্রথমে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘গিবতকারী বা পরনিন্দুক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি)
পুলসিরাতে আটকে যাবে : হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এমন অনেক গিবতকারী আছে, যারা আপতদৃষ্টিতে খুব ভালো আমলকারী। তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং আরও অনেক ইবাদত-বন্দেগি করে। কিন্তু কেয়ামতের দিন তারা যখন পুলসিরাতের কাছে যাবে, তখন তাদের আটকে দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা গিবতের কাফফারা আদায় না করবে, ততক্ষণ পুলসিরাত পার হতে পারবে না। অর্থাৎ যাদের গিবত করেছ তাদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। তারা ক্ষমা না করা পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
গিবত শোনাও পাপ : গিবত করা যেমন পাপ, তেমনি খুশি মনে গিবত শোনাও পাপ। কারও গিবত শুনে চুপ থেকে প্রতিবাদ না করাও কানের গিবত। কেননা গিবত শুনে চুপ থাকা এবং প্রতিবাদ না করা নিজেই গিবত করার শামিল। এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘গিবত শ্রবণকারীও গিবতকারীর একজন।’ (তাবারানি) সাহাবি মায়মুন ইবনে সিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে। আমি বললাম, আমি এটাকে কেন ভক্ষণ করব? সে বলল, কারণ তুমি তোমার অমুক সঙ্গীর গিবত করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালো-মন্দ কথা বলিনি। সে বলল, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। তবে তুমি তার গিবত শুনেছ এবং সম্মত রয়েছ।’(বাগাভি)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যখন কারও গিবত করা হয় তখন গিবতকারীকে গিবত করা থেকে নিষেধ করো। কেননা চুপচাপ বসে থাকলে তুমিও গিবতকারী হিসেবে গণ্য হবে।’ আর যদি নিষেধ করা সম্ভব না হয় তাহলে এর প্রতি মনে মনে ঘৃণা পোষণ করতে হবে। সম্ভব হলে গিবতের মজলিস ত্যাগ করতে হবে অথবা গিবতকারীকে ভিন্ন প্রসঙ্গে মশগুল করার চেষ্টা করতে হবে। এরূপ কোনো চেষ্টা না করলে অবশ্যই গুনাহগার হতে হবে।
