বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব মুসলিমের মিলনমেলায় পরিণত হয় টঙ্গীর তুরাগ তীর। দেশ-বিদেশের লাখো মুসলিম অংশগ্রহণ করেন এই দ্বীনি সমাবেশে। ইমান ও ইয়াকিনের ওপর গুরুত্বারোপ করে সাদামাটা ভাষায় বয়ান করেন দেশ-বিদেশের আল্লাহ ভীরু দাঈ ওলামায়ে কেরাম। তাদের বয়ান শুনে হৃদয় গলে লাখো মুমিনের। যার বহিঃপ্রকাশ ময়দানেই চোখে পড়ে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে মানুষ। বহু এলাকা ও বিভিন্ন স্তরের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একই মানের জীবনমান গ্রহণ করে নির্দ্বিধায়। ময়দানে চোখ বুলালে মনে হবে যেন সবাই একই স্তরের। সেখানে সাদা-কালোর ভেদাভেদ নেই। ধনি-গরিবের পার্থক্য নেই। সবাই এক কাতারের একই ধ্যানের। সবার মানসিক অবস্থা এক ও অভিন্ন। সবর ও শোকরের বাস্তব পরিবেশ এটি। ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা সবার মাঝে। বিশ্বের সব মুমিনই যে পরস্পর ভাই ভাই, এ যেন তার বাস্তব চিত্র।
ইজতেমাকে কেন্দ্র করে টঙ্গী ও আশপাশের এলাকা মানবসমুদ্রে পরিণত হয়। কোথাও পা ফেলার জায়গা থাকে না। এলাকা জুড়ে লাখ লাখ মানুষের জমায়েত। বিশ্বের শতাধিক রাষ্ট্র থেকে আসে বিশ্বাসী মানুষ। ইজতেমা মাঠে কোনো ঠেলাঠেলি নেই। কারও শরীরে ধাক্কা লাগলে বা পায়ে পাড়া লাগলেও অন্য সময়ের মতো কেউ চোখ রাঙায় না। কোনো চিল্লাচিল্লি নেই। শুধু জিকির-আজকার ও তাসবিহ-তাহলিলের ইমানদীপ্ত সেøাগান।
ময়দানে অবস্থানরত একজনের বিছানা অপরজন ব্যবহার করে দেদার। একজনের সামান মাড়িয়ে অপরজন এগিয়ে যায় সামনের কাতারে। একজন আরেকজনকে ডিঙিয়ে চলতে হয়। একজনের গায়ের ওপর দিয়েও যেতে হয় অন্যজনকে। বাথরুমের সামনে দীর্ঘ সিরিয়াল। অজুখানায় লম্বা লাইন। গোসলের সুযোগ পাচ্ছে না অধিকাংশ মানুষ। তবু কেউ অধৈর্য হচ্ছে না। ধৈর্যের এ যেন এক অবিশ্বাস্য চিত্র। কারও মুখে বিরক্তির রেখা নেই। অধৈর্য হয়ে কেউ খেদ প্রকাশ করে না। এ যেন স্বেচ্ছায় কষ্ট সয়ে নেওয়ার এক বিস্ময়কর দৃশ্যপট। ত্যাগের এক বিরল মিলনমেলা।
বিশ্ব ইজতেমায় এসে মানুষের মনে হেদায়াতের ভিত গেঁড়ে যায়। একটি নীরব আবেদন সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। সবরের এক নজিরবিহীন দীক্ষায় দীক্ষিত হয় মানুষ। সবার মাঝে ইমানি জোশ ও আমলের জজবা তৈরি হয়। গোটা দেশে যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে থাকে ধারাবাহিকভাবে। ইজতেমা শেষে হাজার হাজার অংশগ্রহণকারী নিজের ইমান-আমল দুরস্ত করার জন্য এক চিল্লা, তিন চিল্লা ও এক সালে (এক বছরের সফরে) বের হয়ে যায়। দ্বীনি দাওয়াতের মেহনতে নিজেকে নিয়োজিত রাখে লাখো মানুষ। তারা গুনাহের অন্ধকার জগৎ থেকে ইমান, আমল ও সততার আলোকিত ভুবনে প্রবেশ করে। টঙ্গী এলাকার মানুষও ভ্রাতৃত্বের বিছানা বিছিয়ে দেয়। এলাকাবাসী নিজ ঘরদোরকে যেন ওয়াকফ করে দেয়। নিজের হক ছেড়ে অন্য ভাইকে জায়গা করে দিতে সবাই ব্যস্ত হয়ে যায়। যেন ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহিষ্ণুতার এক উন্মুক্ত শিক্ষালয়।
মানুষের ভিতের সবচেয়ে উন্নত চরিত্র হলো ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বহু জায়গায় নিজেকে ধৈর্যধারণকারী ও সর্বসহিষ্ণু হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহই তো সম্যক প্রজ্ঞাময়, পরম সহনশীল।’ (সুরা হজ, আয়াত ৫৯) লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, ইজতেমার মুসল্লিরা সবরকে ছাপিয়ে আরও এক ধাপ ওপরের বৈশিষ্ট্য ‘হিলম’ তথা সহিষ্ণুতার গুণ অর্জন করে নিচ্ছেন। চাইলে জবাব দিতে পারেন, কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করছেন। কেউ অসহিষ্ণু হলেও অন্যজন তাকে নম্রতার সঙ্গে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সহিষ্ণুতা ও সবরের পরকালীন ফায়দার তালিম পেয়ে একজন সাধারণও হয়ে উঠছে সত্যিকারের সহিষ্ণু।
মহান আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত, বিশ্ব মুসলিমের পরকালীন মুক্তি, ইমানের মেহনত, নিজে সংশোধন ও অপরকে সংশোধনের তালিমসহ বিশ্ব ইজতেমা থেকে মানুষ সবর, শোকর ও সহনশীলতার সুমহান শিক্ষা পাচ্ছে। বলা চলে, বিশ্ব ইজতেমা মুসলিম উম্মাহকে শুধু আমলের শিক্ষাই দেয় না; বরং উন্নত চরিত্র গঠনেও ইজতেমা অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।
