একুশে পদকেও নিভছে না আগুন

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:৫১ এএম

নিজের ওপর থেকে আত্মবিশ্বাসটাই উবে গেছে নারী ফুটবলারদের। ভীষণ অস্থির একসময় পার করছেন তারা। এর মধ্যেই পেয়েছেন রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি একুশে পদক পাওয়ার খবর। স্বাভাবিক সময় হলে এই অর্জনে আনন্দে মাতোয়ারা হতেন টানা দুই সাফজয়ী নারী ফুটবলাররা। তার জায়গায় তাদের এ নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র অনুভূতি। দ্বিতীয় সাফ জয়ের তিন মাসের মাথায় ভবিষ্যৎটাই যে ছেয়ে গেছে অনিশ্চয়তার চাদরে। একুশে পদকের সুখবরটা বিদ্রোহের উত্তাল হাওয়া থামাতে পারছে না।

একজন ভিনদেশি সবকিছু তছনছ করে দিয়েছেন। ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার এ দেশকে বারবার সম্মান এনে দেওয়া নারী ফুটবলারদের মুখে যা আসছে, তাই বলে যাচ্ছেন দিব্যি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের চুক্তির আওতায় থেকেও মেয়েদের নিয়ে কটুকথা বাঁধছে না বাটলারের মুখে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নারী ফুটবলকে ধ্বংস করার চক্রান্ত। সমাজের একটা অংশ চান না নারীরা খেলাধুলা করুক। তারাই সোশ্যাল মিডিয়ায় সোচ্চার হয়েছে। মিথ্যে, বানোয়াট এবং মুখরোচক গল্প ফাঁদছে সমানে, যা কোচ বয়কটের আন্দোলনে থাকা ১৮ ফুটবলারকে ক্রমেই নিঃশেষ করে দিচ্ছে। একুশে পদক পাওয়ার এত বড় খবরটাও তাদের আন্দোলিত করছে না। বরং তারা অপেক্ষায় আছেন বাফুফের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের। কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের বিরোধের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে কী লেখা আছে, তা জানতে উদগ্রীব আন্দোলনরত ফুটবলাররা। বাফুফে ভবনের বদ্ধঘরে তাদের দমবন্ধ অবস্থা। তারপরও তারা সেখানেই থাকছেন, শেষটা দেখার আশায়। বাফুফের শীর্ষপর্যায় থেকে এমন একটা রায় আসবে, যাতে বেঁচে থাকে নারী ফুটবলের সম্ভাবনাএই আশায় তারা চূড়ান্ত রায় জানার অপেক্ষায়।

নারী দলের ক্যাম্পে এখন স্পষ্ট বিভাজন। একদিকে ১৮ বিদ্রোহী সিনিয়র, অন্যদিকে ১৩ জুনিয়র। সম্প্রতি এদের অনুশীলনের সুবিধার্থে ক্যাম্পে তোলা হয়েছে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ২০ ফুটবলারকে। বিতর্কিত বাটলার ৩৩ জন নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন আসন্ন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের প্রস্তুতি। এর মধ্যে অনুশীলন বয়কট করাদের অকথা-কুকথা বলে যাচ্ছেন সমানে। এমনকি বিশেষ কমিটির কর্মকাণ্ড চলমান অবস্থায় বাফুফেকেও দোষারোপ করেছেন এখনো ১৮ জনকে ক্যাম্পে রাখায় এবং খাবার সরবরাহ করায়।

নিজেদের অস্তিত্ব যখন সংকটে, তখন মেয়েদের কাছে একুশে পদকের সুখবরটাও স্বস্তি দিচ্ছে না। জোড়া সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন তো এ নিয়ে কথাই বলতে চাইলেন না। তিনি বললেন, ‘এ নিয়ে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই।’ তার মতোই টালমাটাল অবস্থা অন্যদেরও। কৃষ্ণারানী সরকার যেমন বললেন, ‘একুশে পদক রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক। এটা পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার। তবে এ নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত হতে পারছি না। নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, আমরা কেউই ভালো নেই। একদিকে কোচের বিষয়ে বাফুফের সিদ্ধান্ত কী আসে, তা নিয়ে আছি সংশয়ে। তার ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করছে একটি চক্র। আমরা তো কোনো পাপ করিনি। দেশকে পরপর সাফ জিতিয়ে কী ভুল করেছি। কোচ যে ভুল, সেটা তো জলের মতো পরিষ্কার। তারপরও দেশের মানুষ কেন আমাদের ভিলেন বানিয়ে দিচ্ছে?’

সানজিদা আক্তার একুশে পদকের জন্য দলকে মনোনীত করায় সরকারের প্রতি

কৃতজ্ঞতা জানালেন ঠিক, তবে তাদের নিয়ে চলমান সংকটকে ভুলে থাকতে পারলেন না, ‘এমন একটা অর্জন আজ আমরা উদযাপন করতে পারছি না একজন মিথ্যুক কোচের কারণে। সরকার আমাদের একুশে পদকের জন্য মনোনীত করেছে। এই পদক সবার ভাগ্যে জোটে না। আজ আমাদের অনেক বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখেন আমরা কেউই উদ্বেলিত হতে পারছি না। আমরা জানি না আমাদের ভাগ্যে কী লেখা আছে। সবাই আমাদের চালচলন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকা, টিকটক করা নিয়ে কথা বলছে। কিছু সাংবাদিক ভাইকেও দেখছি আমাদের ভিলেন বানাতে উঠে পড়ে লেগেছেন। এসব দেখে কীভাবে ভালো থাকি বলেন। আমরা তো এমন কিছু করছি না, যাতে খেলায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতীতে আমরা অনেক কোচের সঙ্গে কাজ করেছি। এর মধ্যে দেশি কোচ যেমন ছিলেন, বিদেশি কোচও ছিলেন। কই, তারা তো কেউ আমাদের ডিসিপ্লিন নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। আপনারা যারা আমাদের সেই ছোট থেকে দেখেছেন, আপনারাই জানেন কতটা নিয়মের মধ্যে আমাদের থাকতে হয়। সেই ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের ফুটবলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে থাকতে হয়। এর মধ্যে বিশ্রামের সময়টা আমরা যদি টিকটক করি, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাই, সেটা কী অপরাধ? কোচের কী অধিকার আছে, আমাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলার। দেখেন আমরা ভোরে একটা ভালো মন নিয়ে মাঠে যাই। কিন্তু শুরুতেই কোচ এমন একটা কথা বলেন, যাতে মানসিকভাবে আপনি চুপসে যেতে বাধ্য। এ রকম কোচের সঙ্গে কাজ করা যায় না।’

জোড়া সাফ জয়ে বড় ভূমিকা ছিল মাসুরা পারভীনের। অথচ এই ডিফেন্ডারকে সাফের প্রথম ম্যাচে একাদশে রাখেননি বাটলার। তার অপরাধ, খাবার টেবিলে টুপি পড়ে আসা! এটা যে ভব্যতার মধ্যে পড়ে না। সে শিক্ষাটা তো প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা মেয়েদের অজানা। স্থানীয় কোচ যারা ছিলেন, তারাও কখনো বুঝিয়ে দেননি মেয়েদের। অথচ তাকে সুযোগ না দিয়ে ছেঁটে ফেলার কঠোর সিদ্ধান্ত নেন বাটলার। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে নিজে অবস্থানে অনড় থাকতে পারেননি। পুরো দল এক হয়ে মাসুরা এবং মারিয়া মান্ডাকে একাদশে ফেরাতে কোচকে বাধ্য করেন। আর পরীক্ষিত দুই ফুটবলার ফিরতেই বাংলাদেশ ফিরে পায় আগুনে রূপ। সেই আগুনে ভারতকে পুড়িয়ে তারা সেমিফাইনালে চলে আসে গ্রুপসেরা হয়ে। এরপর সেমিফাইনালে ভুটানকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে এবং ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ২-১ গোলে কাঁদিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সাফ জেতে বাংলাদেশ। এরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিপর্যস্ত করে তুলেছে মাসুরাকে। তবে লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাবেন না তিনি, ‘আমাদের কেন অপেক্ষায় রাখা হয়েছে? জানিয়ে দেওয়া হোক বাফুফের সিদ্ধান্ত। আমরা দেখতে চাই, সভাপতি কী সিদ্ধান্ত নেন। আমরা কোনো অপরাধ করিনি। তারপরও কেন আমাদের এত হেনস্তা হতে হবে? কেন কিছু মানুষ আমাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যা মনে তা বলে যাবে? কেন একজন মানসিকভাবে অসুস্থ কোচ আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যে সব অভিযোগ তুলবেন? এত কিছুর পর কী আমাদের ভালো থাকার সুযোগ আছে? রাষ্ট্র আমাদের একুশে পদকের জন্য মনোনীত করেছে। এর জন্য সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। এখন দেশের নারী ফুটবলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রেরও আছে। আমাদের সঙ্গে যা যা ঘটছে, সেসব তাদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। আমরা খেলতে চাই। কিন্তু সেটা অবশ্যই আত্মমর্যাদা অক্ষুণœ রেখে। আত্মসম্মান খুইয়ে আমরা খেলব না।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বিভিন্ন অঙ্গনে আলো ছড়ানো ১৪ ব্যক্তির সঙ্গে একুশে পদকের জন্য নারী ফুটবল দলকে মনোনীত করা হয়েছে। এত বড় স্বীকৃতির পরও মেয়ের ক্ষোভের আগুন কেন নিভছে না, সেটা কী খতিয়ে দেখবে সরকার?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত