জেনারেটর ‘গায়েব’ দেখিয়ে কর্মকর্তাকে ওএসডি!

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:১১ এএম

৯ বছর আগে ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করে কক্সবাজার বিমানবন্দরের বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ করতে কেনা হয় একটি শক্তিশালী জেনারেটর। বসানো হয় বিমানবন্দরে একপাশে একটি ভবনে। দীর্ঘদিন ধরেই জেনারেটরটি সচল এবং সার্ভিস দিচ্ছে। কিন্তু চেয়ার ভাগাভাগি নিয়ে বেবিচকে থাকা একটি চক্র জেনারেটরটি গায়েব করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে। এ কারণে মামলাও হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে।

জানা যায়, ওই মামলায় বেবিচকের রুটিনমাফিক প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল আফরোজসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়। বেবিচক আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করার পাশাপাশি বিভাগীয় মামলা হয়। মামলা ও তদন্তে ঘটনার সত্যতা না পেয়ে শহীদুলকে দায়মুক্ত দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বও দেওয়া হয়। কিন্তু গত বছর নভেম্বর মাসে হঠাৎ করেই জেনারেটরের বিষয়টি আবারও সামনে এলে নামকাওয়াস্তে তদন্তও করা হয়। ‘গায়েব হওয়ার’ অজুহাত তুলে শহীদুল আফরোজকে গত বছর ২৪ নভেম্বর ওএসডি করে কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে বেবিচকে জন্মেছে ক্ষোভ। বিষয়টি নিয়ে আবারও তদন্ত করার জোরালো দাবি উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিনা কারণে শহীদুল আফরোজকে ওএসডি করা হয়েছে। প্রায় দশ মাস তিনি বেবিচকের রুটিনমাফিক প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। দুদক মামলা করেছে কক্সবাজারে। বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে কোনো ধরনের অনিয়ম হওয়ার তথ্য এখন পর্যন্ত মেলেনি। শুধু চেয়ার ভাগাভাগি করা নিয়েই তাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। দুদিন আগে কক্সবাজার গিয়ে জেনারেটরটি সচল দেখে এসেছি। ২৪ ঘণ্টা সেটি সার্ভিস দিচ্ছে। অথচ বেবিচকে ঘাপটি মেরে থাকা চক্রটি গায়েবের অজুহাত তুলে ঘটনাটি ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রথম দফা প্রকল্পে ছিল রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ফুট থেকে ৯ হাজার ফুটে উন্নীত করা এবং সমুদ্রের ভেতর বাতিঘরের মতো নান্দনিক কিছু কাজ করার। সেটি সেভাবে অগ্রসর হলেও স্থানীয় ভূমি হুকুম দখলসংক্রান্ত কিছু জটিলতা সময় লেগে যায়। কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়নের প্রথম পর্বের কাজের পর দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য ২০১৯ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বেবিচক। শর্ত দেওয়া হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর রানওয়ে নির্মাণের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে। ওই সময় দরপত্রটি ক্রয় কমিটিতে অনুমোদন না পাওয়ায় তা বাতিল করে দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেয় সাতটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। অংশ নেয় সান ইঞ্জিনিয়ারিং, লটি এএমএল জেভি, এইচডি এনডিই জেভি, সিএইচইসি মির আখতার জেভি, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কো, সিওয়াইডব্লিউবি-সিসিইসিসি জেভি ও সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। এগুলোর মধ্যে শেষের দুটো সিওয়াইডব্লিউবি-সিসিইসিসি জেভি ও সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড প্রযুক্তিগত মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হয়। যার মধ্যে আর্থিক প্রস্তাবে টিকে যায় সিসিইসিসি। সমুদ্রের নীলাভ জলরাশি ভেদ করে কক্সবাজারে অবতরণ করবে এ-৩৮০ মতো বিশালাকৃতির উড়োজাহাজ। বিমানবন্দরের বর্তমান ৯ হাজার ফুট দীর্ঘ রানওয়েকে মহেশখালী চ্যানেলের দিকে আরও ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারিত করে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হবে। সম্প্রসারিত হতে যাওয়া ১ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ের ১ হাজার ৩০ ফুটই থাকবে সাগরের পানির মধ্যে। দেশে এই প্রথমবারের মতো সমুদ্রের ভেতরে ব্লক তৈরি করে রানওয়ে সম্প্রসারিত করা হবে। কক্সবাজার সমুদ্রতীর ঘেঁষে অত্যাধুনিক এজিএল সিস্টেম তৈরি করা হবে, যা রাতে অন্ধকারে উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় দেখা দেবে অনন্য এক নৈসর্গিক দৃশ্য। মনোমুগ্ধকর নির্মাণশৈলীতে সাজানো হয়েছে গোটা বিমানবন্দরের ড্রয়িং ডিজাইন। এয়ার ফিল্ড লাইটিং সিস্টেম সমুদ্রের জলাবদ্ধতা রক্ষা, সমুদ্র পুনরুদ্ধার, নমনীয় ফুটপাত, সমুদ্রের যথাযথ পদ্ধতিতে আলোক ব্যবস্থার মতো দৃষ্টিনন্দন বস্তুর সমাহার থাকছে এখানে। সমুদ্রতীরবর্তী রানওয়েতে ওঠানামা করবে পৃথিবীর সব বিশালাকৃতির উড়োজাহাজ।

বেবিচক সূত্র জানায়, কক্সবাজার বিমানবন্দরে জেনারেটর কেনার নামে ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বছর পাঁচেক আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, বেবিচকের সাবেক সহকারী পরিচালক (ই/এম) ভবেশ চন্দ্র সরকার, কক্সবাজার বিমানবন্দরের সাবেক ম্যানেজার মো. হাসান জহির, বেবিচকের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মিহির চাঁদ দে এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শহীদুল আফরোজ ও কক্সবাজার বিমানবন্দরের সাবেক উপসহকারী পরিচালক (ই/এম) শহীদুল ইসলাম মণ্ডলকে আসামি করে মামলা করে দুদক।

এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কক্সবাজার বিমানবন্দরের জন্য একটি ৩০০ কেভিএ জেনারেটর কেনার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তা-ঠিকাদার যোগসাজশে জেনারেটরটি না কিনে ক্রয় দেখিয়ে ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। এ অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করে দুদক। দীর্ঘ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে দুদকের চট্টগ্রাম অঞ্চল-২-এর উপপরিচালক মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। তবে ওই সময় বেবিচক বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে ঘটনার তদন্ত করে। বিভাগীয় মামলাও করা হয়। বিভাগীয় মামলা থেকে শহীদুল আফরোজ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। বেবিচকের তদন্তেও বলা হয়েছে, জেনারেটর ক্রয় করা হয়েছে। সার্ভিসও দিচ্ছে ঠিকমতো। পরে তাকে দায়মুুক্তি দিয়ে বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় ১০ মাস তিনি দায়িত্ব পালন করার পর হঠাৎ পুরনো বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হয়। গত ২৪ নভেম্বর তাকে আবারও ওএসডি করে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয় হাবিবুর রহমানকে। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে দুদকে। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে সরাতে উচ্চ আদালতে রিটও করা হয়েছে। আগামী ২৩ মার্চ থেকে তার অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত