সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই

টাস্কফোর্স কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশয়

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:১৮ এএম

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের করণীয় বিষয়ে শতাধিক সুপারিশ করেছে। কিন্তু টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা দলিল হিসেবে স্বীকৃত নয়। ফলে কোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা বা ম্যাপিং করা হয়নি। তাই এটি বাস্তবায়নে কোনো মন্ত্রণালয়ের তাগিদ দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে টাস্কফোর্স কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশয় দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আগের সরকারের গৃহীত পরিকল্পনাগুলো স্থগিত বা বাতিল করা হয়। ওইসব পরিকল্পনার মান নিয়ে প্রশ্নও ছিল। নতুন করে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম চালু রাখার স্বার্থে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত সেপ্টেম্বরে তাৎক্ষণিক ও অত্যাবশ্যকীয়ভাবে করণীয় কিছু কাজ সম্পাদনের ছক নির্ধারণে একটি টাস্কফোর্স কমিটি করে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনটিতে অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ৩০টি সুপারিশ চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা কার, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে প্রতিবেদনটি অনেকটা মাস্তুলবিহীন জাহাজের মতো হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবিধানের ১৫তম অনুচ্ছেদে পরিকল্পনা উপায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। সেই মোতাবেক দেশের রাজনৈতিক সরকারগুলো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও পিআরএসপির মতো পরিকল্পনা গ্রহণ করে নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার যেসব পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল, সেগুলোতে রাষ্ট্রের সর্বস্তরের অংশীজনের দাবি ও আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়নি। সেগুলো একপ্রকার দলীয় ইশতেহারের পর্যায়ে থেকে যায়। আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা স্থগিত করে করণীয় নির্ধারণে গঠিত হয় টাস্কফোর্স কমিটি।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তারা প্রতিবেদনটি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে শেয়ার করবেন। তারা সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সুপারিশগুলো বাছাই করে বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে দেশের ইতিহাসে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ছাড়া স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নের নজির নেই। সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়। সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয়গুলো নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু টাস্কফোর্স কমিটির প্রতিবেদনের বেলায় এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই এটির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ে খোদ টাস্কফোর্স কমিটির সদস্যরাই।

কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে বলে মনে করছেন কমিটির সদস্য ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।

দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় এ প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে তাদের সেগুলো বাস্তবায়নে যদি বাধ্য করা না হয়, তাহলে প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা নেই।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘শ্বেতপত্র ও টাস্কফোর্সের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে সরকারের তরফ থেকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এসব প্রতিবেদন কাগুজে নথি হিসেবেই থেকে যাবে।’

৫২৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ১৭টি অধ্যায় রয়েছে। এসব অধ্যায়ে বিভিন্ন খাতভিত্তিক সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে সামষ্টিক অর্থনীতির পারফরম্যান্স এবং সামষ্টিক আর্থিক চালকগুলোর মধ্যে যে চরম মাত্রার সংকট বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সে বিষয়টির ওপর একটি পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আর্থিক নীতি ও বাজেটীয় নীতি, বিনিময় হার এবং নীতি সুদহার, মুদ্রাস্ফীতির চাপে সরবরাহ-শৃঙ্খলে সৃষ্ট বিষয়াদি, শুল্কহার যৌক্তিকীকরণ, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং দেশীয় ও বহিস্থ সম্পদ সংগ্রহে মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ইস্যুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে কৃষির উন্নয়ন ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ খাতে জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ত্রুটিমুক্ত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা, উন্নত ফসলের জাত এবং চৌকস আর্থিক ও বীমা ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো চালু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং পণ্যবৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি প্রস্তুত করার ওপর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এমএসএমই খাত অর্থনীতিতে সম্ভাব্য যে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে, তার গুরুত্ব বিবেচনায় পঞ্চম অধ্যায়ে খাতটির চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিতকরণে তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করা হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সংস্কারের সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে যথাক্রমে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ খাতগুলোকে যাতে এফডিআইর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, সে বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্টেম (এসটিইএম), প্রকৌশল ও আইটি বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ন্যূনপক্ষে একটি বিশ্বমানের আইআইটি-ধরনের গবেষণা ও শিক্ষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য খাতে বামরুনগ্রাদ বা গ্লেনিয়াগেলসের মতো বিশ্বমানের হাসপাতাল গোষ্ঠীর তরফ থেকে এফডিআই উন্মুক্ত করার বিষয়েও সরকারের কাছে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

অষ্টম অধ্যায়ে অবকাঠামো ও সংযোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অধ্যায়টিতে সাধারণ অবকাঠামো খাতে ন্যূনতম সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বৃহৎ ও মেগা প্রকল্পগুলোর নকশা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের দক্ষতা অর্জন এবং এ খাতে ঘাতসহনশীলতা স্থাপন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিরীক্ষা করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে কমিটি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা (বেস্ট প্র্যাকটিসেস) অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে। নবম অধ্যায়ে জলবায়ু ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমিটি ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীকে পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। দশম অধ্যায়ে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশের মধ্যে বিইআরসি ও স্রেডাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্য অধ্যায়গুলোতে দেশের আর্থিক খাতের চরম সংকট এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার, গ্রাম ও শহরের মধ্যকার বৈষম্য কমানো, সামাজিক সুরক্ষা ইস্যু ও এর চ্যালেঞ্জ, জাতীয় উন্নয়নে যুবসমাজের ভ‚মিকা প্রভৃতি বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
আগামী বাজেটে বেশ কিছু সংস্কারের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি মনে করেন, ‘বর্তমান সরকার খুব বেশি দিন সময় পাবে না। সে ক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের কাজে হাত দিতে হবে দ্রুততার সঙ্গে। আগামী বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত