রাজনীতি হবে দেশের মানুষের কল্যাণে। যেখান থেকে উপকৃত হবে জাতি। কিন্তু কয়েকজন রাজনীতিবিদ রাজনীতিকে করেছেন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের পথ। ‘রাজনীতি’কে অধিকাংশই মনে করেন, ক্ষমতা এবং টাকার মহোৎসব। বর্তমানে অভাব আদর্শিক রাজনীতিবিদদের। বর্তমানে যে রাজনীতিকে টাকা এবং ক্ষমতার চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই রাজনীতি কখনো দেশ এবং জাতির জন্য কল্যাণ আনতে পারে? বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। আগামীর বাংলাদেশ হবে তারুণ্যের দক্ষতানির্ভর বাংলাদেশ, যেখানে তরুণরা তাদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে রাষ্ট্রকে নিয়ে যাবে এক অনন্য উচ্চতায়। তরুণদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠবে স্বপ্নের বাংলাদেশ।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তরুণদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে তরুণরাই। পরিসংখ্যান মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ তরুণ। আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি নির্ভর করছে তরুণদের ওপর। ফলে তারুণ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গড়ে তুলতে হবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। যে কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। মুখস্থ ও চাকরিনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে এসে বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। বিশেষ করে মনোযোগ দিতে হবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায়। প্রণোদনা বাড়াতে হবে গবেষণা খাতে। আগামীর বাংলাদেশ হতে হবে পুরোপুরি জ্ঞানভিত্তিক ও তথ্যভিত্তিক। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে তরুণদের। আগামীর বাংলাদেশ হবে মাদক, সন্ত্রাস এবং লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিমুক্ত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী, জনগণ সব ক্ষমতার উৎস।
সমতার ভিত্তিতে একটি প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে, নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ। গড়ে তুলতে হবে স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যার মূলে থাকবে জনগণের কল্যাণ। সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে সুধী সমাজকে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর দ্রুত সমাধানে কাজ করতে হবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আগামী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো দল বা ব্যক্তির হস্তক্ষেপ হতে দেওয়া যাবে না। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আগামীর বাংলাদেশে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। ভোট প্রয়োগের অধিকার জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। ফলে নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন হতে হবে ইতিবাচক। সংবিধানকে জনগণের জন্য হতে হবে, যেখানে থাকবে শুধুই জনগণের কল্যাণ। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংস্কারের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতা এমনভাবে বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না থাকে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নজর দেওয়া প্রয়োজন। সুতরাং জনগণের জন্য হবে সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়।
রাজস্বনীতি, করনীতি, ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও সংস্কার প্রয়োজন। পোশাকশিল্পের বাজার সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয়ের পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে প্রযুক্তিতে দক্ষ করে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে দারিদ্র্যমুক্ত, বৈষম্যহীন দেশ গড়ে তুলতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনায় রেখে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ। আগামীর বাংলাদেশে থাকবে না কোনো অসাম্য ও বৈষম্য, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার মৌলিক অধিকার তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পাবে। প্রত্যেকে তার উদ্ভাবনী শক্তি ও সৃজনশীলতা দিয়ে দেশ গঠনে অবদান রাখবে। তরুণ প্রজন্মের বর্তমান রাজনীতির প্রতি একটা অনীহা কাজ করে। যেখানে আজকের তরুণরা নেতৃত্ব দানের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে তরুণদের মধ্যে তৈরি হয়েছে রাজনীতির প্রতি এক ধরনের অনীহা। এর কারণ কী?
রাজনীতি হচ্ছে সেবা। যার মধ্য দিয়ে উপকৃত হবে জাতি। তবে সেবার কথা রাজনীতিবিদদের মাথায় থাকে তখনই, যখন নির্বাচনে দাঁড়ানো বা জয়ী হওয়ার প্রশ্ন আসে। এরপর সেবা নামের শব্দ তাদের মাথায় আর থাকে না। তখন সেবার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের ওপর পেশিশক্তি খাটিয়ে করা হয় অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম। আদর্শভিত্তিক রাজনীতি, সুশাসন ও দেশের উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলে। আদর্শচ্যুত রাজনীতি সমাজ বা রাষ্ট্রকে কিছুই দিতে পারে না। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবে আদর্শ, জনকল্যাণ, আত্মত্যাগ ও নৈতিকতা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনীতি করতে হবে আদর্শকে ধারণ করে। সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করলে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করা যায়। যদি সততা, নিষ্ঠা, আদর্শ মনে ধারণ করে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া না যায়, তাহলে দেশ আগামীতে হারাবে সঠিক নেতৃত্ব। অসহায় হয়ে পড়বে সাধারণ মানুষ। পিছিয়ে পড়বে দেশ। বাংলাদেশ আসলে কোন পথে যাবে? বাংলাদেশ মূলত তারুণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞান, মানবিকতা আর বিশ্বাস এই তিন বিষয় হাত ধরাধরি করে না চললে আমরা এগোতে পারব না। অনৈক্য দূর করা জরুরি। সব ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অমীমাংসিত বিষয়ে মতভেদ দূর করে যদি নিজেদের একক ও একমাত্র বাংলাদেশি পরিচয়ে সতেজ রাখা যায়, তাহলেই তা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, রাজনীতি ও নেতৃত্ব দূরদৃষ্টিসম্পন্ন না হলে কোনো জাতি এগোতে পারে না। কারণ, জনকল্যাণই গণতান্ত্রিক রাজনীতির শেষ কথা।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
