আগুনে ঘর পুড়ে ঠাঁইহীন কড়াইল বস্তির শতাধিক পরিবার

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৫ এএম

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা এবং বনানীর কড়াইল বস্তিতে গত শুক্রবার রাতের আগুনে পুড়েছে শতাধিক ঘর ও ১৬টি গাড়ি। বস্তির মানুষ এক কাপড়ে জীবন নিয়ে বের হতে পারলেও হারিয়েছে তাদের মাথা গোজার ঠাঁই। অন্যদিকে খিলগাঁওয়ে দুই দশকে গড়ে ওঠা গাড়ির গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপে পুড়েছে কোটি কোটি টাকার দামি গাড়ি। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, এ আগুনের নেপথ্যে রয়েছে ষড়যন্ত্র। তারা তদন্তের মাধ্যমে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে চান। এই দুই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়েছে কয়েকশ মানুষ।

গতকাল শনিবার সকালে তালতলার গ্যারেজপট্টিতে গিয়ে দেখা যায়, শুক্রবার রাতের আগুনে গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপে থাকা ১৮টি গাড়ি পুরোপুরি পুড়ে গেছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোড়া গাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া পুড়েছে সাতটি মোটরসাইকেল। দোকানের পোড়া টিন আর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জায়গায় জায়গায় স্তূপ হয়ে আছে। এ ছাড়া আগুনে পাশের একটি স-মিল ও সেখানে থাকা বেশকিছু কাঠ পুড়ে গেছে।

খিলগাঁও, শাজাহানপুর, সবুজবাগ, মুগদা এবং রামপুরা অঞ্চলের বাংলাদেশ অটোমোবাইল মালিক সমিতির সভাপতি ও মাসুম অটো ওয়ার্কশপের মালিক মো. মাসুম বলেন, ‘শুক্রবার আগুন লাগার সময় মার্কেটের মালিক ও কর্মচারীরা সবাই পিকনিকে ছিলেন। সেখানে থাকা অবস্থায় আগুনের খবর পেয়ে দ্রুত যে যার মতো চলে আসি। এসে দেখি সব পুড়ে ছাই, কিছুই পাইনি। ২০ বছর ধরে এ এলাকায় ব্যবসা করি। কোনোদিন কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু কালকে (শুক্রবার) কেউ ছিলেন না, তখন আগুন লাগল।’

গ্যারেজপট্টির আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মুন্না মিয়া বলেন, ‘শুক্রবার গ্যারেজ মালিক সমিতির পিকনিক ছিল। ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ গ্যারেজ সেই পিকনিকের কারণে বন্ধ ছিল। এ ছাড়া শুক্রবার ও একুশে ফেব্রুয়ারির কারণে কর্মচারীরা ছুটিতে ছিলেন। মাত্র দুজন দারোয়ান ছিলেন গ্যারেজে। আমরা আগুনের খবর পেয়ে এসে দেখি, সবকিছু পুড়ে গেছে।’

গ্যারেজেপট্টির আরেক দোকান মালিক বলেন, ‘আমার দোকানে ছয়টি প্রাইভেট কার ছিল, রিপেয়ারিং করার (মেরামত) জন্য। এর মধ্যে অধিকাংশ গাড়ি রিপেয়ারিংয়ের কাজ শেষ ছিল। আজ (গতকাল শনিবার) বেশ কয়েকটি গাড়ি ডেলিভারি দেওয়ার কথাও ছিল। কিন্তু আগুনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গাড়ির ভেতরে যেসব কাগজপত্র ছিল সেগুলোও সব পুড়ে গেছে। এ ছাড়া আমার দোকানে যত মালামাল ছিল সব পুড়ে ছাই। আবার কীভাবে ব্যবসা চালু করব তা বুঝে উঠতে পারছি না। এখানে যাদের দোকান ছিল সবার পরিস্থিতি একই।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একটি স-মিল থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে তা গাড়ির গ্যারেজগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে গ্যারেজে থাকা বিভিন্ন গাড়িতে আগুন লেগে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। তখন আশপাশের মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে। প্রথমে গ্যারেজের এক কোণে আগুন লাগে। পরে একটি বিস্ফোরণ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘খিলগাঁওয়ের আগুনে আনুমানিক ২০টি দোকান ও দুটি স-মিল পুড়েছে। আগুনে হয়তো কেমিক্যালের ড্রাম বিস্ফোরিত হয়েছিল, যার ফলে আগুন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আমাদের ১০টি ইউনিট কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গাড়ি মেরামতের কাজে যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয় সেগুলো খুবই দাহ্য পদার্থ। এ ছাড়া গাড়িতে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস সিলিন্ডার থাকে। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার সঠিক কারণ জানতে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি তদন্ত করছে থানা পুলিশ। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে কী কারণে আগুনের সূত্রপাত এবং এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’

এ বিষয়ে খিলগাঁও থানার ওসি দাউদ হোসেন বলেন, ‘যেহেতু আগুনে কেউ হতাহত হয়নি, সেহেতু আপাতত কোনো মামলা হয়নি। তবে এ ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে। আগুনের কারণ জানতে বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে আমরা তদন্ত করছি।’

এদিকে মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে গত শুক্রবার মধ্যরাতে আগুন লাগে। এতে পুড়েছে শতাধিক ঘর। নিম্নআয়ের মানুষ রাতে যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে গভীর ঘুমে ছিলেন, তখনই হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। এক কাপড়ে জীবন নিয়ে বের হন নিম্নআয়ের এসব মানুষ। ঘর থেকে তারা কিছুই বের করতে পারেননি।

তাদেরই একজন ষাটোর্ধ্ব নারী নূরজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার কোনো সন্তান নেই। এই বস্তিতে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে আছেন। গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোরকমে খেয়েপড়ে জীবন পার করছেন। শুক্রবার রাতে আগুন লাগার পর দ্রুত এক কাপড়ে বের হন। বাসার সব পুড়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁশ, কাঠ ও টিনের তৈরি ঘরগুলো পুড়ে ছাই হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা সেই পোড়া ছাইয়ের মধ্যেই শেষ সম্বলটুকু খুঁজে ফিরছেন।

হাসিনা বেগম নামে এক নারী বলেন, তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। আট বছর ধরে এই বস্তিতে আছেন। এর আগে আরও তিনবার আগুনে পুড়েছে তাদের ঘর। কোনো কিছুই বের করতে পারেননি তিনি। তিন সন্তান নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে থাকছেন। গতকাল দুপুরে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সিটি করপোরেশন থেকে খাবার দিয়েছিল, তাই খেয়েছেন। তবে কোথায় আশ্রয় নেবেন বা মাথা গোজার ঠিকানা তার জানা নেই।

ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, কয়েলের আগুন অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। এ ঘটনাতেও আগুনের কারণ জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত