কক্সবাজার বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে বিমানবাহিনীর নির্মাণাধীন ঘাঁটিতে হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ফাঁকা গুলি ছোড়া হয় এবং দুর্বৃত্তদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে বিমানবাহিনীর চারজন সদস্য আঘাত পান। এ ছাড়া শিহাব কবির নাহিদ (৩০) নামের এক যুবক নিহত হন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। গতকাল সোমবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শিহাব বিমানবাহিনীর ঘাঁটির পাশে সমিতিপাড়ার প্রবীণ শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিনের ছেলে।
আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্থানীয় এক লোকের মোটরসাইকেলের কাগজপত্র না থাকায় বিমানবাহিনীর প্রভোস্ট কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঘাঁটির অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সমিতিপাড়ার দুই শতাধিক স্থানীয় লোক বিমানবাহিনীর ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হলে বিমানবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাধা দেয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে চেকপোস্ট এলাকায় বিমানবাহিনীর সদস্য ও সমিতিপাড়ার কিছু লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় তারা বিমানবাহিনীর সদস্যদের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে। এতে বিমানবাহিনীর চারজন সদস্য (একজন অফিসার ও তিনজন বিমানসেনা) আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং শিহাব কবির নাহিদ নামের এক যুবক গুরুতর আহত হন। পরে তাকে বিমানবাহিনীর গাড়িতে করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বিমানবাহিনীর সদস্যরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আইএসপিআর বিবৃতিতে আরও জানায়, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার্থে বিমানবাহিনীর সদস্যরা বাহিনীর আইন অনুয়ায়ী ফাঁকা গুলি ছোড়েন। তবে স্থানীয় জনসাধারণের ওপর কোনো ধরনের তাজা গুলি ছোড়া হয়নি। স্থানীয় জনগণের ইটপাটকেলের আঘাতে বিমানবাহিনীর গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। এ ছাড়া স্থানীয় জনগণ ঝোপঝাড়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন, যা পরে আর বেশি সম্প্রসারিত হয়নি। এমতাবস্থায় একটি কুচক্রী মহল বিমানবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিমানবাহিনীর গুলিতে ওই যুবক নিহত হয়েছেন বলে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যি নয়। এ ক্ষেত্রে প্রচারিত গুলির খোসার ছবিটি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ওই খোসাটি ফাঁকা গুলির, যা প্রাণঘাতী নয়, শুধু শব্দ তৈরি করে। যুবক নিহতের ঘটনায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গভীর শোক ও পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছে।
জানা গেছে, নিহত নাহিদ পিটিআই স্কুলের সাবেক সুপার নাছির উদ্দিন ও কক্সবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষিক আমেনা বেগমের ছেলে। সংঘর্ষে ছয়জন চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের পুলিশ বক্সের কর্তব্যরত ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম।
স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরির জন্য পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সরকারি খাসজমি অধিগ্রহণ করে বিমানবাহিনী। সেই লক্ষ্যে প্রায় ১৫ বছর আগে এলাকাবাসীকে পুনর্বাসন করতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার তালিকা তৈরি করা হয়। ইতিমধ্যে প্রায় দেড় হাজার পরিবারকে সদর উপজেলা খুরুশকুলের আশ্রয়ণ প্রকল্পে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করে বাহিনী। কিন্তু এরই মধ্যে ৫ আগস্টের পর ১ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাসকারী প্রায় ৩০ হাজার লোক বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে না যাওয়ার ঘোষণা দেন। তারা ১ নম্বর ওয়ার্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসের দাবি তুলে মানববন্ধনসহ প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেন। উচ্ছেদ রোধে কুতুবদিপাড়ার সাবের হোসেনের ছেলে জাহেদুল ইসলাম, দিদারুল ইসলাম রুবেল, সমিতিপাড়ার সাইফুল ইসলাম, মোস্তফাসহ আরও কয়েকজন নেতৃত্ব দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার বিমানবাহিনী একটি ঘর উচ্ছেদ করতে গেলে জাহেদুল ইসলামের নেতৃত্বে এলাকার লোকজন বাধা দেন। এরই জের ধরে গতকাল বেলা ১১টায় জাহেদ শহরের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আসার পথে তাকে চেকপোস্টে আটক করে বিমানবাহিনী। খবর পেয়ে এলাকাবাসী এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে বিমানবাহিনীর সঙ্গে সমিতিপাড়া ও কুতুবদিয়াপাড়ার লোকজনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করলে বিমানবাহিনী প্রথমে ফাঁকা গুলি ছোড়ে ও পরে লোকজনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহরের বাহারছাড়ার পিটিআই স্কুলের সাবেক সুপার নাসির উদ্দিনের ছেলে শিহাব কবির নাহিদ নিহত হন। এ ছাড়া ওই সময় আরও ছয়জন গুলিবিদ্ধ হন। তারা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সমিতিপাড়ার বাসিন্দা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, দুপুরে বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এলাকাবাসীকে অন্যত্রে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে বিমানবাহিনী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং এলাকাবাসীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক নির্ধারণ ছিল। এই লক্ষ্যে বেলা ১১টার দিকে সমিতিপাড়ার বাসিন্দা মো. জাহিদ হোসেনসহ আরও কয়েকজন ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে আসেন। তাদের বহনকারী গাড়িটি ডায়াবেটিক পয়েন্ট এলাকার বিমানবাহিনীর চেকপোস্টে পৌঁছালে থামানো হয়। এ সময় জাহেদ হোসেনের সঙ্গে কর্তব্যরত বিমানবাহিনীর সদস্যদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে খবর পেয়ে এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে জড়ো হয়। এ সময় এলাকাবাসী জাহেদকে নিয়ে যেতে বাধা দিলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও বলেন, এ সময় বিমানবাহিনীর নির্মাণাধীন ঘাঁটি ও সদস্যদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। থেমে থেমে আধা ঘণ্টা ধরে চলা ওই পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। তাতে গুলিবিদ্ধ হন শিহাব কবির নাহিদ। স্থানীয় লোকজন শিহাবকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় একজন নিহত ও আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে, তা উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি মো. ইলিয়াস খান বলেন, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। ঘটনাস্থলে ৫০-৬০ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল আরোহী একজনকে বিমানবাহিনীর তল্লাশিচৌকিতে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
১ নম্বর ওয়ার্ডের অপসারিত কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, স্থানীয় কুতুবদিয়াপাড়ার জাহেদ নামের মোটরসাইকেল আরোহী এক তরুণের হেলমেট না পরার ঘটনা নিয়ে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গুলিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত শিহাবের মা আমেনা খাতুনের দাবি, ইটপাটকেল নিক্ষেপের সময় শিহাব ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একটি গুলি মাথায় এসে লাগে। গুলিতে মাথার খুলি উপড়ে মগজ বেরিয়ে আসে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে ঘটনাস্থলে যাওয়া বিএনপির মৎস্যজীবীবিষয়ক সম্পাদক ও কক্সবাজার-রামু আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘সমিতিপাড়া ও কুতুবদিয়াপাড়ার প্রায় ৩০ হাজার লোক উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই এক মাস ধরে আমি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করছি। এরই মধ্যে এ ঘটনা। আপাতত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। আমি আশা করছি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এর একটি সুষ্ঠু সমাধান পাবে জনগণ।’
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সাবোক্তগীন মাহমুদ বলেন, দুপুরে হাসপাতালে আনার কয়েক মিনিটের মধ্যে শিহাবের মৃত্যু হয়েছে। আঘাতে তার মাথার পেছনের অংশ (খুলি) উড়ে গেছে। গুলিতে, নাকি ইটপাটকেলের আঘাতে মাথায় জখম হয়েছে, তা এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে।
